
মোঃ শরীফুল আজম(বাবু)
গাইবান্ধা:
শিক্ষক মানেই আস্থা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মানেই নিরাপদ পরিবেশ। একজন শিক্ষার্থী যখন কোনো শিক্ষকের কাছে যায়, তখন তার প্রত্যাশা থাকে জ্ঞান, দিকনির্দেশনা ও নিরাপত্তা। কিন্তু সেই আস্থার জায়গাটিই যদি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত স্বার্থ, অনৈতিক যোগাযোগ কিংবা যৌন শোষণের সুযোগ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তাহলে প্রশ্ন ওঠে,আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার ভেতরে কোথায় তৈরি হচ্ছে এই অন্ধকার?
দেশের বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক কর্তৃক শিক্ষার্থীকে যৌন হয়রানি, নিপীড়ন ও অনৈতিক সম্পর্কে জড়ানোর অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের দায়িত্ব তদন্তকারী সংস্থা ও আদালতের। তবে বিচ্ছিন্ন ঘটনাগুলোর বাইরে একটি বৃহত্তর সামাজিক প্রশ্ন ক্রমেই সামনে আসছে,কেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পেশাগত সীমারেখা ভাঙার ঘটনা প্রতিরোধে আমরা এখনও কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারিনি?
প্রাইভেট কোচিং কি হয়ে উঠছে ঝুঁকির আরেক দরজা?
শিক্ষাব্যবস্থার একটি বাস্তবতা হলো,অনেক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ের পাশাপাশি শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট বা কোচিং করে। এটি নিজে কোনো অনৈতিক বিষয় নয়। কিন্তু যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারি কম, সেখানে ব্যক্তিগত কোচিংয়ের পরিবেশকে কেউ কেউ অপব্যবহার করতে পারেন,এমন অভিযোগও বিভিন্ন সময়ে সামনে এসেছে।
একান্ত কক্ষে দীর্ঘ সময় অবস্থান, ব্যক্তিগত মোবাইল যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা, আলাদা করে ডেকে পাঠানো কিংবা নম্বর ও পরীক্ষার ফলাফলের সঙ্গে ব্যক্তিগত সুবিধা দেওয়ার ইঙ্গিত,এসব আচরণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য সতর্ক সংকেত হওয়া উচিত।
বিশেষ করে কোনো শিক্ষক যদি শিক্ষার্থীর নম্বর, পরীক্ষার ফলাফল কিংবা একাডেমিক ভবিষ্যৎকে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সঙ্গে যুক্ত করেন, তাহলে সেটি নিছক ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করে।
তবে এটিও মনে রাখা জরুরি,প্রাইভেট কোচিং করা মানেই অনৈতিকতা নয় এবং অধিকাংশ শিক্ষকই দায়িত্বশীলভাবে শিক্ষা দিয়ে থাকেন। প্রশ্নটি তাদের নিয়ে, যারা শিক্ষাদানের সুযোগকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেন।
প্রেম নাম দিলেই কি শোষণ আর শোষণ থাকে না?
সমাজে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর কথিত প্রেমের সম্পর্ককে কখনো কখনো রোমান্টিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। সাহিত্য, নাটক, সিনেমা কিংবা সামাজিক আলোচনায় এর নানা উদাহরণও রয়েছে।
কিন্তু বাস্তব জীবনে বিষয়টি বিচার করতে হলে আবেগের পাশাপাশি ক্ষমতার সম্পর্কটিও দেখতে হবে।
একজন শিক্ষক শিক্ষার্থীর নম্বর দেন, মূল্যায়ন করেন, কখনো শাস্তি বা সুপারিশের ক্ষমতাও রাখেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থী থাকে তুলনামূলকভাবে নির্ভরশীল অবস্থানে।
তাই এই সম্পর্কের মধ্যে যদি ভয়, প্রলোভন, নম্বর, সুবিধা, চাপ কিংবা শিক্ষকের কর্তৃত্ব কাজ করে, তাহলে সেটিকে সহজভাবে ‘প্রেম’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়া বিপজ্জনক।
আর শিক্ষার্থী অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে বিষয়টি আরও গুরুতর এবং আইনগতভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা পায়।
অভিভাবকের সম্মতি থাকলেও প্রশ্ন থেকে যায়:
কখনো কখনো সামাজিকভাবে এমন কথাও শোনা যায়, দুজনের সম্মতি ছিল, পরিবার জানত, তারা পরে বিয়ে করবে ইত্যাদি।
কিন্তু অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে এমন যুক্তি শিশুর সুরক্ষার মৌলিক প্রশ্নকে আড়াল করতে পারে। অভিভাবক বা সমাজের কারও সম্মতি কোনো শিশুকে যৌন শোষণ বা নিপীড়নের ঝুঁকিতে ফেলার বৈধতা হতে পারে না।
অভিভাবকের দায়িত্ব হলো সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, কোনো ক্ষমতাবান প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতাকে স্বাভাবিক ধরে নেওয়া নয়।
বিচারহীনতা অপরাধকে উৎসাহিত করতে পারে:
কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ উঠলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার নামে ঘটনা চাপা দেওয়া, ভুক্তভোগীকে চুপ থাকতে বলা কিংবা সামাজিক সম্মানের ভয়ে তদন্ত এড়িয়ে যাওয়া,কোনোটিই সমাধান নয়।
প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে আইনের যথাযথ প্রয়োগ।
একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও গ্রহণযোগ্য নয়। ন্যায়বিচারের অর্থ হলো,ভুক্তভোগীর অধিকার রক্ষা এবং অভিযুক্তের ক্ষেত্রেও যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দরকার স্পষ্ট সীমারেখা:
শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের স্পষ্ট আচরণবিধি থাকা প্রয়োজন। প্রাইভেট কোচিং, ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যোগাযোগ, একান্তে সাক্ষাৎ এবং শিক্ষার্থীর সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা জরুরি।
অভিযোগ জানানোর জন্য শিক্ষার্থীদের এমন ব্যবস্থা থাকতে হবে, যেখানে তারা শিক্ষক বা প্রতিষ্ঠানের প্রতিশোধ কিংবা সামাজিক চাপের ভয় ছাড়াই কথা বলতে পারে।
দায় শুধু শিক্ষকের নয়
এ ধরনের ঝুঁকি প্রতিরোধে শিক্ষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষা প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা সহ সবার দায়িত্ব রয়েছে।
শিক্ষকদের বুঝতে হবে, একজন শিক্ষার্থীর দুর্বলতা বা বিশ্বাস তাদের ব্যক্তিগত সুযোগ নেওয়ার অধিকার দেয় না।
অভিভাবকদের বুঝতে হবে, ভালো ফলাফলের জন্য সন্তানের ওপর অতিরিক্ত চাপ কিংবা কোনো শিক্ষকের প্রতি অন্ধ আস্থা কখনো সন্তানের নিরাপত্তার বিকল্প হতে পারে না।
আর শিক্ষার্থীদের জানতে হবে,কেউ শিক্ষক হলেও তার কোনো অনৈতিক দাবি মেনে নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
