
— মহিউদ্দিন মহিন
আমার শৈশব ছিল জল আর আকাশের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক স্বপ্নময় রাজ্য। সে রাজ্যে ভোর হতো পাখির ডাকে, সকাল জাগত জলাশয়ের ঢেউয়ে, আর দিন কাটত ডানার শব্দে শব্দে। আজও চোখ বন্ধ করলে দেখি—শৈশবের সেই জলচর পাখিগুলি যেন জলকেলি করতে করতে উড়ে বেড়ায় আমার স্বপ্নের জলাশয়ে, আমার হৃদয়ের নীলাকাশে।
ঘুম ভেঙেই ছুটে যেতাম পুকুর, বিল কিংবা খালের ধারে। সেখানে সকাল থেকেই বসত জলচর পাখিদের মেলা। সারাদিন জলের ভেতর দৌড়াদৌড়ি করত ডাহুক পাখি। সামনে থেকে দেখলে তার বুকের অংশ ধবধবে সাদা, সারা শরীর গাঢ় কালো—রঙের কী অপূর্ব মেলবন্ধন! ঠোঁটের গাঢ় লালচে-বাদামি রং যেন প্রকৃতির নিখুঁত তুলির টান। সারাদিন সে তুলত ব্যতিক্রমী সুর, কখনো কিচিরমিচির, কখনো করুণ, কখনো আবার আনন্দে ভরা ডাক—যেন জলাশয়কে নিজের ভাষায় কথা শোনাচ্ছে।
বর্ষার সময় ডাহুক পাখিকে দেখা যেত অনেকগুলি বাচ্চা নিয়ে জলের কিনারায় ঘুরে বেড়াতে। গাঢ় কালো রঙের, দেখতে মুরগির বাচ্চার মতো সেই ছানাগুলো মানুষের উপস্থিতি টের পেলেই ডুব দিত জলের মধ্যে। জলজ আগাছার ভেতরে আত্মগোপন করত তারা—প্রকৃতির কাছ থেকেই যেন লুকিয়ে থাকার পাঠ নিয়েছিল।
এদিক-সেদিক তাকালেই চোখে পড়ত পানকৌড়ির দল। জলের গভীরে ডুব দিয়ে মাছ কিংবা কোনো ছোট জলজ প্রাণী ঠোঁটে করে তুলে আবার ভেসে উঠত। শিকার না পেলে নিঃশব্দে আবার ডুব দিত, দূরে কোথাও গিয়ে উঠত জলের বুক চিরে। মানুষের আলাপ পেলে ডানা ঝাপিয়ে উড়ে গিয়ে পুকুরপাড়ের গাছের ঢালে বসত, নতুবা মিলিয়ে যেত দূরের অজানা নীলাকাশে।
আমাদের বাড়ির আশেপাশে আঙিনায় রংবেরঙের টুনটুনি পাখিরা টুনটুন শব্দ করে উড়ে বেড়াত। কখনো ঘরের পাশে দুই পাতা জোড়া দিয়ে বাসা বানাতে দেখতাম। নিজের চোখেই দেখেছি—ডিমে তা দিচ্ছে, ছোট ছোট বাচ্চা লালন করছে। আমাদের দেখলেই উড়ে যেত, কিন্তু বাসা ছেড়ে যেত না—এতটাই নির্ভয় ছিল তাদের জীবন।
মেঠো ঘরের ভিটা ছিদ্র করে মাছরাঙ্গারা বানাত তাদের বাসা। গ্রামের মানুষ তাদের তাড়াত না। অনায়াসে আসা-যাওয়া করত তারা। বাসায় বাচ্চা ফুটলে ঠোঁটে করে ছোট মাছ কিংবা জলজ কোনো প্রাণী এনে আদর করে খাওয়াত। বাচ্চাগুলোর ক্ষুধার্ত আওয়াজ কিচিরমিচির শব্দে ভরে উঠত দুপুরের নীরবতা।
আমাদের শৈশবে অনেকেরই ঘর ছিল নাড়া, কুটা, ছন, ডাবনা পাতা কিংবা তালপাতার। সেই ঘরের চালার ভেতর বাসা বেঁধে সংসার করত ছোট ছোট চড়াই পাখি। সারাদিন তারা উড়ে বেড়াত এদিক-সেদিক, ধান কিংবা বুনো গোটা খুঁটে খুঁটে খেত, মুখে করে বাচ্চাদের জন্য খাবার এনে দিত। কোনো কোনো ঘরের চালায় শত শত চড়াই পাখির বাসা ছিল—ভয়হীন, নিশ্চিন্ত, অবাধ এক সহাবস্থান।
একটু বৃষ্টি হলেই হাজার হাজার বক পাখি উড়ে বেড়াত জলাশয়ের উপর। একটু উঁচু জমি পেলে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকত শিকারের অপেক্ষায়। অনেক সময় অপেক্ষা করতে করতে আলসেমিতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকত। কচুরিপানার মধ্যে থাকত অসংখ্য ছোট জাতের বক—আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় যাদের বলতাম কোড়া পাখি। মরচে লাল রঙের কোড়া কচুরিপানার ডগার ভেতর লুকিয়ে থেকে ডিমে তা দিত, অলস জীবনযাপন করত, আর সারাদিন ডাকাডাকিতে মুখরিত রাখত আমাদের গ্রাম।
আমাদের শৈশবে দুই জাতের কাক দেখা যেত। কালো রঙের কাককে বলতাম দাঁড় কাক , আর ছোট সাইজের কালো রঙের বড় কাককে বলতাম পাতি কাক। এরা বেশি থাকত শহরে, তবে মাঝে মাঝে গ্রামে এসে আকাশে ব্যতিক্রমী শব্দ তুলে একটু ঘুরপাক খেয়ে চলে যেত।
বড় বড় গাছে ঝুলে থাকত অসংখ্য কলাবাদুড়, আর ছোট ছোট চামচিকা উড়ে বেড়াত এদিক-সেদিক। শীতের মৌসুমে নাম না জানা অসংখ্য বাহারি রঙের ছোট পাখিতে ভরে যেত গ্রাম। সকাল-সন্ধ্যায় তাদের কলকাকলিতে মুখরিত থাকত। বড় বড় তালগাছে ঝুলত বালিয়ার বাসা। শীত এলেই খাল-বিল ভরে যেত অতিথি পাখিতে—জলের উপর জলকেলি করতে করতে তারা এসে পড়ত আমাদের জীবনে, আবার নিঃশব্দে হারিয়ে যেত অচেনা পথের বাঁকে।
আজ তারা আর নেই। কিন্তু তাদের দল আজও ভেসে বেড়ায় আমার হৃদয়-সাগরে। তারা উড়ে বেড়ায় আমার হৃদয়ের নীলাকাশে। আমি শুধু স্মৃতির কোঠরে খুঁজে বেড়াই সেই নীড়হারা পাখিদের। রাতের বেলায় হুতুম প্যাঁচার ডাক এখনো কানে বাজে। অসংখ্য চিল শকুন উড়ে বেড়ায় আমার হৃদয়-আঙিনায়।
এই ছিল আমার দুরন্ত শৈশব—যেখানে মানুষ আর প্রকৃতি আলাদা ছিল না, পাখিরা ছিল পরিবারের অংশ, আর গ্রাম ছিল এক জীবন্ত কবিতা। আজ সেই কবিতার অনেক পংক্তি মুছে গেছে, তবু স্মৃতির পাতায় তারা চির অমলিন।
