
মোঃ শরীফুল আজম (বাবু)
গাইবান্ধা:
রংপুর নগরের কামালকাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দুই তরুণকে আটকের ঘটনা শুধু একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অগ্রগতি নয়—এটি সমাজ ও রাষ্ট্রের সামনে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার নিয়ে একটি গভীর সতর্কবার্তাও।
পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়াকে কেন্দ্র করে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও তাঁদের দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। হত্যার পর ঘটনাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে ঘরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে রেখে ডাকাতির নাটক সাজানোরও চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় আটক সিদ্ধার্থ দাস (১৯) ও মুগ্ধ দাস (২৩) সম্পর্কে মামাতো–ফুফাতো ভাই। পুলিশ বলছে, নিহত পরিবারের সঙ্গে তাঁদের আগে থেকেই পরিচয় ছিল।
ঘটনার বর্ণনা শিউরে ওঠার মতো। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নির্মাণাধীন ভবনের ছাদে ইয়াবা সেবনের সময় বাধা দেওয়ায় প্রথমে গণপতি চক্রবর্তীকে হত্যা করা হয়। এরপর তাঁর স্ত্রী, মেয়ে এবং ঘরে ঘুমিয়ে থাকা ১৩ বছর বয়সী ছেলেকেও হত্যা করা হয়। একটি পরিবারের চারটি প্রাণ মুহূর্তের মধ্যে নিভে যাওয়ার এই ঘটনা আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—মাদক কি শুধু একজন ব্যক্তিকে ধ্বংস করছে, নাকি ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দিচ্ছে পরিবার, সমাজ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও?
মাদক শুধু অপরাধ নয়, একটি সামাজিক বিপর্যয়
মাদকাসক্তি কোনো ব্যেক্তির একক সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। একজন তরুণ যখন মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ে, তার প্রভাব পড়ে পরিবার, শিক্ষা, কর্মজীবন, সামাজিক সম্পর্ক এবং আইনশৃঙ্খলার ওপর। মাদকের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে চুরি, ছিনতাই, সহিংসতা, সন্ত্রাস, পারিবারিক নির্যাতন এবং ভয়াবহ অপরাধ।
রংপুরের এই হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা হবে তারই একটি ভয়ংকর উদাহরণ।
আজকের তরুণরাই আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচাললা করবে। তাদের একটি অংশ যদি মাদকের ভয়াল গ্রাসে হারিয়ে যায়, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু কয়েকটি পরিবার নয়
ক্ষতিগ্রস্ত হবে পুরো দেশ।
সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের প্রতি জোরালো আহ্বান
মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান যেন কেবল বিচ্ছিন্ন অভিযান বা কয়েক দিনের কর্মসূচিতচে সীমাবদ্ধ না থাকে। মাদকের উৎস, সরবরাহব্যবস্থা, বিক্রেতা, পৃষ্ঠপোষক ও অর্থের প্রবাহ শনাক্ত করে কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
একই সঙ্গে মাদকবিরোধী কার্যক্রমে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, অভিভাবক, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে মাদক ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাড়া-মহল্লাভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম আরও জোরদার করা জরুরি। শুধু মাদকসেবীকে আটক করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না; চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সমাজে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
সচেতন সমাজের এখনই জেগে ওঠার সঠিক সময়
একজন তরুণের আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিলে পরিবারকে তা উপেক্ষা না করে সচেতন হতে হবে। অভিভাবকদের সন্তানদের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। প্রতিবেশী হিসেবে আমাদেরও দায়িত্ব রয়েছে—মাদক বিক্রি বা সেবনের কোনো তথ্য জানা গেলে নীরব না থেকে আইনগত কর্তৃপক্ষকে জানানো।
কারণ আজ যে মাদক অন্যের ঘরে ঢুকছে, কাল সেটি আমাদের নিজের ঘরেও পৌঁছাতে পারে।
গণপতি চক্রবর্তী ও তাঁর পরিবারের মর্মান্তিক পরিণতি আমাদের জন্য একটি কঠিন শিক্ষা। অপরাধের বিচার অবশ্যই হতে হবে। একই সঙ্গে সেই কারণগুলোও চিহ্নিত করতে হবে, যেগুলো একজন তরুণকে মাদকের অন্ধকারে ঠেলে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তাকে ভয়াবহ অপরাধের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাদকমুক্ত রাখাই হোক অঙ্গীকার
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ তরুণদের হাতে। তাদের হাতে বই থাকবে, প্রযুক্তি থাকবে, সৃজনশীলতা থাকবে, কর্মদক্ষতা থাকবে—মাদকের প্যাকেট নয়।
রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে, সমাজকে সচেতন হতে হবে মাদক প্রতিরোধে এবং পরিবারকে দায়িত্বশীল হতে হবে সন্তানদের ভবিষ্যৎ রক্ষায়।
রংপুরের চারজন মানুষের নির্মম মৃত্যু যেন কেবল একটি মামলার এজাহার, তদন্ত ও বিচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। এই ঘটনা থেকে রাষ্ট্র ও সমাজ যদি শিক্ষা নেয়, মাদকের বিরুদ্ধে আরও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠে এবং একটি প্রজন্মকে অন্ধকার থেকে ফিরিয়ে আনা যায়—তবেই এই মর্মান্তিক ঘটনার ভেতর থেকে একটি ইতিবাচক শিক্ষা বেরিয়ে আসবে।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়া শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, সমাজ, পরিবার এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। আজ আমরা নীরব থাকলে আগামী প্রজন্ম তার মূল্য দেবে। তাই এখনই সময় মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার।
ক্যাপশন- প্রতীকি ছবি
