
— মহিউদ্দিন মহিন
আমি জন্মেছি নদীর দেশে, ভাঙনের ভূখণ্ডে— যেখানে মানুষের ভাগ্য নদীর স্রোতের মতোই অনিশ্চিত। আমার জন্ম ভোলা সদরে সবুজে মোড়া গঙ্গাকীর্তি গ্রামে। এই গ্রাম আমার কাছে শুধু বসবাসের স্থান নয়— এ আমার স্মৃতি, আমার বেদনা, আমার গর্ব। গ্রামের বুক চিরে বয়ে চলেছে প্রমত্তা মেঘনা— যে নদী আমাদের শৈশবকে রাঙিয়েছে আনন্দে, আবার বড় হতে শিখিয়েছে কষ্ট আর সংগ্রামের পাঠ।
আমার শৈশবে মেঘনা আজকের মতো ভয়ংকর প্রশস্ত ছিল না। নদীর ওপারেই ছিল নোয়াখালীর বিস্তৃত সবুজ ভূমি। সন্ধ্যার সময় নদীর পাড়ে দাঁড়ালে চোখে পড়ত ওপারের কুপি বাতির ক্ষীণ আলো, কানে ভেসে আসত অচেনা মানুষের জীবনযাত্রার নীরব ডাক। সেই দৃশ্য আমার শিশুমনে সৃষ্টি করত এক অদ্ভুত কৌতূহল— নদী যেন দুই তীরের মানুষের মাঝে এক অদৃশ্য গল্পের সেতু।
মেঘনার জলের বুকে তখন খেলত শুশুক— ভোলা জেলার স্থানীয় ভাষায় যাদের আমরা ডাকতাম ‘ছুছুম’ বা ‘তেলিগো বউ’ বলে। কালো চকচকে দেহ, গরু-মহিষের মতো মাথা আর জলের ভেতর বাঁকা হয়ে ভেসে ওঠা সেই প্রাণীগুলো ছিল আমার শৈশবের এক জীবন্ত বিস্ময়। জেলেদের জাল থেকে মাছ ছিনিয়ে নেওয়া অর্ধটুকু খাওয়া বাকি অংশ ফেলে চলে যাওয়া তাদের কাছে ছিল স্বাভাবিক খেলা। কেউ বলত, শুশুক নদীর আশীর্বাদ; আবার কেউ শত্রু ভেবে নির্বিচারে হত্যা করত। তাদের চর্বি থেকে ওষুধ বানানোর কুসংস্কার ছিল সমাজে প্রচলিত। আজ শুশুক নেই— হারিয়ে গেছে নদীর বুক থেকে, হারিয়ে গেছে আমার শৈশবের এক রহস্যময় অধ্যায়।
কিন্তু মেঘনা কেবল রূপকথার নদী ছিল না। সে ছিল ভাঙনের প্রতীক, আতঙ্কের নাম। আমি শৈশবেই দেখেছি তার করাল গ্রাস। গভীর রাতে ভাঙনের শব্দ শুনে ঘুম ভেঙে যেত— মনে হতো যেন কোনো দানব মাটি চিবিয়ে খাচ্ছে। এক রাতেই ভিটেমাটি, গাছপালা, স্মৃতি— সব গিলেনিত নদী। সময়ের স্রোতে নজরুল্লা, পাতাবুনিয়া, মদনপুরের মতো কত গ্রাম বিলীন হয়ে গেছে মেঘনার গহ্বরে। কত পরিবার ছিন্নমূল হয়েছে, কত শিশু হারিয়েছে জন্মভূমির ঠিকানা।
তবু এই নদীই এক সময় ছিল জীবিকার আশ্রয়। মেঘনার ইলিশ ছিল কিংবদন্তি। বড় বড় ডিমওয়ালা ইলিশের ঝাঁক জেলেদের জীবনে এনে দিত স্বচ্ছলতা। সেই দিনগুলো এখন শুধুই স্মৃতি। নদী ভাঙনের সাথে সাথে নিঃস্ব হয়ে গেছে অসংখ্য জেলে পরিবার। আজও অনেক মানুষ সরকারি বেড়িবাঁধের পাশে পলিথিনের চালা তুলে মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের ঘরে আলো নেই, খাবার নেই, নিরাপত্তা নেই। শিশু ও নারীরা ভোগে অপুষ্টিতে, রোগ-শোক নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়ায়।
জেলেদের জীবনের আরেক নির্মম বাস্তবতা হলো দাদন প্রথা। অল্প কিছু ধনবান মহাজনের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নিয়ে তারা মাছ ধরতে বাধ্য হয়। পরে ন্যায্যমূল্যের অনেক কম দামে সেই মাছ বিক্রি করতে হয় মহাজনের কাছেই। প্রতিবাদের কোনো ভাষা নেই— মুখ বুজে অন্যায় সহ্য করাই নিয়তি। মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা এলে জীবিকা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তখন ক্ষুধাই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শত্রু। ঝড়-বৃষ্টি আর উত্তাল নদীর সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে অনেক জেলে আর ফিরে আসে না— মেঘনার বুকেই তাদের চিরনিদ্রায় সলিল সমাধি হতো ।
আজও ভোলা জেলার আনাচে-কানাচে এই নিঃস্ব মানুষের কষ্টের দীর্ঘশ্বাস বাতাসে মিশে থাকে। মেঘনার বুকে আর শুশুকের খেলা নেই, ইলিশও আগের মতো জালে ধরা দেয় না। নদীতে যত জাল, তত প্রতিযোগিতা— আর ততই বাড়ে ক্ষুধা আর হতাশার আর্তনাদ।
তবু এই নদী, এই ভাঙন, এই দারিদ্র্যই আমাকে গড়ে তুলেছে। মেঘনার তীরে বেড়ে ওঠা আমার শৈশব আমাকে শিখিয়েছে— জীবন মানে শুধু পাওয়া নয়, হারানোও। নদী যেমন জীবন দেয়, তেমনি মুহূর্তে সব কেড়ে নেয়। তার গর্জনের ভেতরেই লুকিয়ে আছে ভোলার মানুষের কান্না, সংগ্রাম আর অমোঘ ভাগ্যের নির্মম কাহিনি।
আমার শৈশব তাই শুধু ব্যক্তিগত স্মৃতি নয়— এটি এক জনপদের ইতিহাস, এক নদীবিধ্বস্ত মানুষের আত্মকথা। মেঘনার মতোই আমার জীবন— কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল; কিন্তু প্রবাহমান, অবিরাম এগিয়ে চলা।
