
— মোঃ মহিউদ্দিন
রাতের নিস্তব্ধতা নদীর বুকেও কখনো কখনো ভারি হয়ে নামে। পদ্মা-মেঘনার মাঝখানে ছোট্ট একটি লঞ্চ এগিয়ে চলে ধীরে ধীরে—চাঁদের আলোয় তার ছাদের ওপর শুয়ে আছে এক অসহায় শিশু। পাশে স্তব্ধ হয়ে রাখা বাবার নিথর দেহ। নদীর বাতাসে ওড়ানো চাদরে ঢাকা সেই দেহ যেন বারবার প্রশ্ন করে—“আর কতদিন আমাদের এরকম যাত্রা সহ্য করতে হবে?”
এ দৃশ্যটি কোনো উপন্যাসের নির্মম অধ্যায় নয়। এটি ভোলার প্রতিদিনের সংগ্রামের এক নগ্ন, অনাবৃত সত্য।
এ দেশের কোনো দ্বীপের মানুষ যখন বাবার দাফনে যাচ্ছে, তখন তার যাত্রাপথ হয় নদীপথে—বেদনার ঢেউ আর কাঠের সিটের শব্দে ভরা। অথচ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে কেউ মারা গেলে পরিবার সড়কপথে সামান্য সময়েই পৌঁছে যায় নিজ গ্রামে।
কিন্তু ভোলা জেলার মানুষ ?
তাদের শেষ বিদায়টুকুও নদীর ওপর ভাসমান কষ্টের স্রোতে পাড়ি দিতে হয়।
১. দাফনের যাত্রা—আরেক মানসিক মৃত্যু
শিশুটি লঞ্চের ছাদে বাবার পাশেই ঘুমিয়ে আছে। হয়তো সে জানেই না, এই ঘুম ভেঙে গেলে পৃথিবী আর আগের মতো থাকবে না। লঞ্চের চুলায় রান্নার ধোঁয়া উড়ে এসে তাকে ছুঁয়ে যায়, মাঝরাতের বাতাসে কাপড়ে ঠাণ্ডা জমে। তবুও সে বাবার দেহের পাশে শুয়ে আছে—কারণ, সেটাই তার শেষ ভরসা।
এই দৃশ্য একা কোনো পরিবারের নয়, এটি পুরো ভোলার যন্ত্রণার প্রতীক—যেখানে একটি সেতুর অভাব মানুষের মৃত্যুর পরও তাকে আরেকবার কষ্ট দিয়ে যায়।
২. ভোলা–বরিশাল সেতু: একটি অবকাঠামো নয়, একটি মানবিক দায়িত্ব
যে সেতু নির্মাণ হলে ভোলার মানুষ মধ্যরাতে ঢাকার হাসপাতাল থেকে মরদেহ নিয়ে লঞ্চ ধরতে না হতো।
যে সেতু হলে সন্তানকে ছাদের ওপর বাবার পাশে শুইয়ে নদীর বাতাসে কাঁপতে হতো না।
যে সেতু হলে এক অসুস্থ মানুষকে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া যেত, হয়তো সে বাঁচতও।
এই সেতুটি কোনো “উন্নয়ন প্রকল্প” নয়—এটি মানবিক বাঁচার অধিকার।
ভোলা–বরিশাল সেতু মানে—
গর্ভবতী মায়ের জীবনরক্ষা,
শিক্ষার্থীর স্বপ্নের পথ খোলা,
ব্যবসার গতিতে নতুন আলো,
আর মানুষের মৃত্যুর পর মরদেহ নিয়ে আর নদীপথের কষ্ট না পাওয়া।
৩. কেন আমরা হাহাকার করি? কারণ প্রতিটি ভোলাবাসী এ কষ্ট চেনে—নিজের মতো করে
একটি দ্বীপের মানুষ হিসেবে ভোলাবাসী প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে নদীর ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছে।
কিন্তু নদীর মতোই অনিশ্চিত তাদের যাতায়াত, চিকিৎসা, ব্যবসা, শিক্ষা, এমনকি শেষ বিদায়ও।
যখন মায়ের অসুস্থতায় ছেলেরা বরিশালের হাসপাতালে নিতে দৌড়ায়—
নৌযান পেতে বিলম্ব মানে জীবন ও মৃত্যুর সীমানা আরও সরু হওয়া।
যখন কোন শিক্ষার্থী ভর্তি পরীক্ষায় যেতে চায়—
ঝড়, বর্ষা, ঘাট বন্ধ—তার স্বপ্ন থমকে যায়।
যখন কৃষকের পাকা ধান নদীপথে ঢাকায় পৌঁছাতে দেরি হয়—
মূল্য কমে যায়, শ্রম মাটি হয়।
এই বেদনাগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়।
এগুলো বেঁচে থাকার সংগ্রাম।
এগুলো চোখের জল, দীর্ঘশ্বাস, আর প্রতিদিনের ক্লান্ত সত্য।
৪. একটি সেতু, একটি নতুন ইতিহাস মাত্র
ভোলা–বরিশাল সেতু নির্মিত হলে—
একটি দাফনের যাত্রা আর হবে না নদীর ওপরে শুয়ে থাকা সন্তানের ছবি,
একটি মায়ের যন্ত্রণার সময় আর নৌযানের অপেক্ষায় কাটবে না,
একটি শিক্ষার্থীর স্বপ্নের পথে আর নদীর স্রোত বাধা হবে না,
একটি অঞ্চলের উন্নয়ন আর পিছিয়ে থাকবে না।
এই সেতু শুধু ইট-বালুর সংযোগ নয়—
এটি দুই প্রজন্মের আর্তনাদ থামানোর প্রতিশ্রুতি।
৫. ঘুমন্ত ভোলাবাসীকে জাগানোর সময় এখনই
আমরা কেন শেয়ার করি?
আমরা কেন বলি—“আর নয়, আমাদের দাবি পূরণ করো”?
কারণ, এই ছবির এই লোকটি কারও ভাই, কারও ছেলে, কারও নাতি।
কারণ, যেদিন এই কষ্টকে আমরা আর ‘নিত্যদিনের ঘটনা’ বলে মেনে নেব না, সেদিনই সত্যিকার পরিবর্তনের সূচনা হবে।
ভোলার মানুষ কখনো দয়া চায়নি—তারা শুধু তাদের ন্যায্য অধিকার চায়।
একটি সেতু, যা তাদের জীবন ও মৃত্যুর মাঝে আরেকটি যন্ত্রণার রেখা টেনে দেবে না।
শেষ কথা—
এই ছবিটি কোনো ভাইরাল কন্টেন্ট নয়—এটি একটি ইতিহাসের মুখবন্ধ।
একটি সেতু নির্মিত হলে হয়তো ভবিষ্যতের কোনো সন্তানকে বাবার মরদেহের পাশে লঞ্চের ছাদে ঘুমোতে হবে না।
হয়তো একটি পরিবারের শেষ যাত্রা হবে সম্মানের, কষ্টের নয়।
তাই—
এটি শুধু লাইক করার নয়, শেয়ার করে ঘুমন্ত ভোলাবাসীকে জাগানোর সময়।
একটি সেতুর দাবি মানে একটি অঞ্চলের মানবিক দাবি।
আর মানবিক দাবি কখনো নিস্তব্ধ থাকে না—আমরা সবাই মিলে তাকে উচ্চারণ করি, ধ্বনিত করি, ইতিহাসে পরিণত করি।
# লেখক : কবি,সাহিত্যিক, সিনিয়র লেকচারার
