
— মোঃ মহিউদ্দিন
ঢাকার প্রাণকেন্দ্র শাহবাগ—যেখানে ইতিহাস বহুবার পথ বদলেছে, যেখানে তরুণের চিৎকারে কেঁপে উঠেছে রাষ্ট্র, যেখানে প্রতিবাদের আগুনে জ্বলে উঠেছে পরিবর্তনের নতুন অধ্যায়। ঠিক সেই শাহবাগ আজ আবারও উত্তাল—কারণ একটাই, ভোলা–বরিশাল সেতু চাই, এখনই চাই।
মানুষের ভিড়ে ঢেকে যাওয়া মোড়—
শুক্রবার বিকেলের দিকে যখন রোদ ধীরে ধীরে নরম হচ্ছিল, শাহবাগের প্রতিটি প্রান্ত থেকে ভেসে আসছিল ঢোলের তালে তালে স্লোগান, “এখনই চাই সেতু—উন্নয়নের পথ খুলে দাও”। হাতে প্ল্যাকার্ড, কাঁধে জাতীয় পতাকা, আর মুখে দৃঢ় প্রত্যয়—ভোলার মানুষ যেন একসাথে দাঁড়িয়ে গেছে তাদের প্রজন্মের দীর্ঘদিনের অবহেলার প্রতিকারে।
মিছিলের সামনে হাঁটছিলেন বিভিন্ন বয়সের মানুষ—মাতৃকোলে শিশু, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, নৌযাত্রার কষ্টে ক্লান্ত নিত্যযাত্রী শ্রমিক, আর সেইসব মা-বাবা যারা বছরের পর বছর ধরে ফেরিঘাটে অপেক্ষার যন্ত্রণা বইছেন। শাহবাগের অলিগলি আজ পরিণত হয়েছিল এক প্রান্তিক জেলার দীর্ঘশ্বাস থেকে উঠে আসা বঞ্চনার মহাসমাবেশে।
“দাদুর লাশ নিয়ে লঞ্চে ফিরতে হয়েছিল…”—এক তরুণের তীব্র ব্যথা
মিছিলের মাঝেই দাঁড়িয়ে ছিলেন ২৪ বছরের বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া শফিক। গলা কেঁপে উঠছিল, তবুও বললেন—
“দাদু মারা গেলেন ভোরে। ভোলা যেতে লঞ্চ ছাড়া উপায় ছিল না। বৃষ্টি, অন্ধকার, আর লাশ নিয়ে ৮ ঘন্টার ভ্রমণ—আপনি বলতে পারেন, এ কষ্ট কেন এখনো আমাদের সইতে হয়?”
তার কথার সঙ্গে মাথা নাড়লেন আশপাশের মানুষজন। সে যেন একজনের ব্যথা নয়—ভোলার হাজারো পরিবারের চিরচেনা বেদনার গল্প।
অর্থনীতির সম্ভাবনার স্রোত আটকে আছে এক খানি সেতুর অভাবে
ভোলা দেশের সবচেয়ে বড় দ্বীপ জেলা—গ্যাস, কৃষি, মৎস্য, শিল্প, বাণিজ্য—সব সম্ভাবনাই আছে। কিন্তু সেতুর অভাবে সেই সম্ভাবনা যেন আটকে আছে বিশাল নদীর ওপারে।
ব্যবসায়ী সাইদুল বলছিলেন—
“ভোলা থেকে ঢাকায় পণ্য আনতে সকাল–বিকাল লঞ্চ ধরে থাকতে হয়। সময় আর খরচ দুই-ই দ্বিগুণ। সেতু হলে আমরা দেশের অর্থনীতির বড় শক্তি হতে পারতাম।”
বিক্ষোভকারীদের প্ল্যাকার্ডে তাই লেখা—
“ভোলা শুধু দ্বীপ নয়—এ দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যৎ”
শাহবাগের বাতাসে ভেসে আসা ঐক্যের সুর
আজকের দিনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়েছিল, তা হলো মানুষে–মানুষে অদ্ভুত এক ঐক্য। এখানে রাজনৈতিক বিভাজন নেই, নেই দল–মত–সম্প্রদায়ের হিসাব। সবাই এক দাবিতে একত্র—একটা সেতু দরকার, খুব দরকার।
শাহবাগের মাঝখানে দাঁড়িয়ে কয়েকজন শিক্ষার্থী গান ধরলেন—
“এই সেতু হবে আমাদের পথ, এই সেতু হবে উন্নয়নের রথ…”
গান যেন মুহূর্তেই আন্দোলনকে আন্দোলিত করে তুলল।
ট্রাফিক থেমে গেলেও থামেনি মানুষের দাবি
পুলিশ বসেছিল ব্যারিকেড, কিন্তু আন্দোলন ছিল শান্তিপূর্ণ। ট্রাফিক থেমে গেছে, কিন্তু মানুষের স্রোত থামছে না। গাড়ির যাত্রীরা হর্ন না বাজিয়ে খোলা জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছেন—কেউ কেউ আবার মোবাইল তুলে লাইভ করছেন।
এক ড্রাইভার বললেন—
“আমি বরিশালের মানুষ। ভোলার সেতু হলে শুধু ভোলার উন্নয়ন হবে না, পুরো দক্ষিণাঞ্চল বদলে যাবে।”
গতরাতে সন্ধ্যার পরে শাহবাগ যেন মোমবাতি মিছিলের শহর—
আলো কমতেই আন্দোলনের পুরোটাই যেন নতুন রূপ নিল। শত শত মোমবাতি জ্বলে উঠল একসাথে। লাল আগুনের আলোতে লেখা বার্তা—
“বঞ্চনার অবসান চাই”
“ভোলার মানুষের জীবন মান উন্নয়ন জাতীয় অধিকার”
মোমবাতির আলোয় শাহবাগের আকাশও যেন প্রতিবাদের আগুনে লাল হয়ে উঠেছিল।
শেষবিন্দু নয়—এ আন্দোলন শুরু হলো
বক্তারা ঘোষণা দিলেন—
“এটি কেবল শহরের প্রতিবাদ নয়, এটি উপকূলের মানুষের বাঁচার দাবি।
ভোলা–বরিশাল সেতু নির্মাণ না হওয়া পর্যন্ত এ আন্দোলন থামবে না।”
মানচিত্রের একটি দ্বীপের দাবি—আজ জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
একটি সেতু যেন শুধু ইট–বালুর নয়, মানুষের অধিকার, মর্যাদা আর উন্নয়নের স্বপ্নের রূপ।
# লেখক : কবি, সাহিত্যিক , সিনিয়র লেকচারার
