
মোঃ ওসমান গনি ইলি, স্টাফ রিপোর্টার:
রোহিঙ্গা সংকটের এক দশক পূর্তিকে সামনে রেখে রোহিঙ্গা সাড়াদান কর্মসূচিতে আসা তহবিলের ব্যবহার, প্রকল্প বাস্তবায়ন, স্থানীয় এনজিওর অংশগ্রহণ এবং ক্রমবর্ধমান অর্থায়ন সংকট নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে সংকটের প্রভাব বহনকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য আরও কার্যকর সহায়তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে।
সোমবার (২৫ আগস্ট) কক্সবাজার প্রেসক্লাবে কক্সবাজার সিএসও-এনজিও ফোরামের উদ্যোগে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ছিল—“Where is the Funding for the Rohingya Response Going?” অর্থাৎ ‘রোহিঙ্গা সাড়াদান কর্মসূচির তহবিল কোথায় যাচ্ছে?’
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা সাড়াদান কর্মসূচিতে মোট ৬৩টি প্রকল্পে ৫১৯ মিলিয়ন টাকা অর্থায়নের তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক এনজিওর ২৮টি প্রকল্পে ৩৩০ মিলিয়ন টাকা, জাতীয় এনজিওর ৩২টি প্রকল্পে ১৭৬ মিলিয়ন টাকা এবং স্থানীয় এনজিওর মাত্র ৩টি প্রকল্পে ১৩ মিলিয়ন টাকা অর্থায়ন করা হয়েছে। এতে মোট অর্থায়নের তুলনায় স্থানীয় এনজিওগুলোর সরাসরি অংশগ্রহণ অত্যন্ত কম বলে দাবি করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, রোহিঙ্গা সাড়াদান কর্মসূচিতে স্থানীয় সংস্থাগুলোর জন্য তহবিলের ব্যবস্থা থাকলেও বাস্তবে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা অনেক সংগঠন সরাসরি অর্থায়নের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ফলে স্থানীয় এনজিওগুলোর অভিজ্ঞতা, সক্ষমতা ও মাঠপর্যায়ের সম্পৃক্ততাকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর দাবি জানানো হয়।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় UNOCHA-এর অর্থায়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ১৫০ মিলিয়ন ডলার রোহিঙ্গা সংকটে বরাদ্দের মধ্যে ৯২ শতাংশ জাতীয় সংস্থা এবং ৮ শতাংশ আন্তর্জাতিক এনজিও পেয়েছে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সংগঠনগুলোর সরাসরি অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, ২০২৪ সালের শুরু থেকে ১ লাখ ৫০ হাজারের বেশি নতুন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ফলে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপরও অর্থনৈতিক, সামাজিক ও পরিবেশগত চাপ বাড়ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাবাসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন কমে যাওয়ায় মানবিক সহায়তা কার্যক্রমও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।
এ অবস্থায় রোহিঙ্গা সাড়াদান কর্মসূচিতে স্থানীয় এনজিওকে সরাসরি অর্থায়ন, সব সেক্টরে স্থানীয় সংগঠনগুলোর কো-লিডারশিপ নিশ্চিত, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য সরাসরি তহবিল বৃদ্ধি এবং স্থানীয় সংগঠনগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের দাবি জানানো হয়।
পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় অংশীজনদের মধ্যে সমতাভিত্তিক অংশীদারিত্ব ও পারস্পরিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা, রোহিঙ্গা সাড়াদান কর্মসূচিতে স্থানীয়করণ কৌশল প্রণয়ন এবং অর্থায়নের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংবাদ সম্মেলনে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়, নিরাপদে ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরির আহ্বান জানানো হয়। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমন্বিত উদ্যোগ আরও জোরদার করার দাবি জানানো হয়।
আয়োজকদের মতে, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক সহায়তার বিষয় নয়; এটি কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা, পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলছে। তাই আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্থ কোথায়, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে ব্যয় হচ্ছে, তা আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হওয়া প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলন থেকে রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধান, আন্তর্জাতিক অর্থায়ন অব্যাহত রাখা, স্থানীয় এনজিও ও জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং দ্রুত, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের জন্য কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।
এসময় কোস্ট ফাউন্ডেশন এর সহকারী পরিচালক মোঃ জাহাঙ্গীর আলম সঞ্চলনায় কক্সবাজার প্রেসক্লাব এর সাধারণ সম্পাদক মমতাজ উদ্দিন বাহারী ও সাংবাদিক ইউনিয়ন এর সভাপতি নুরুল ইসলাম হেলালিসহ আরো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেরর কর্মকর্তা বক্তব্য রাখেন। এসময় আরো উপস্থিত ছিলেন পিন্ট মিডিয়া ও ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন মিডিয়ার সংবাদকর্মীরা।
