গাইবান্ধায় মাদকবিরোধী অভিযানে প্রশ্ন—ছোট চালান ধরা পড়লেও বড় কারবারিরা অধরা কেন?
মোঃ শরীফুল আজম (বাবু)
গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
গাইবান্ধা সদর উপজেলা ও জেলা শহরসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, জেলা পুলিশ, গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার কথা জানা গেলেও জনসাধারণের একটি অংশের প্রশ্ন?মাদকবিরোধী অভিযান চলার পরও বড় মাদক কারবারি ও বড় চালানগুলো কেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়ছে না?
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গাইবান্ধা শহর ও সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি রুট ব্যবহার করে মাদক প্রবেশ ও সরবরাহের ঘটনা ঘটছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য ও অভিযোগ দেখা যায়। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নির্ভরযোগ্য সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদে গাইবান্ধা জেলায় অতীতেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ মাদক উদ্ধারের ঘটনা রয়েছে। ২০২৫ সালে গোবিন্দগঞ্জে একটি ট্রাক তল্লাশি করে ৫৯০ গ্রাম হেরোইন উদ্ধারের মামলায় তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন আদালত। এর আগে গাইবান্ধা সদরেও হেরোইন ও ইয়াবাসহ গ্রেপ্তারের ঘটনা সংবাদমাধ্যমে এসেছে।
ফলে প্রশ্নটি শুধু অভিযান হচ্ছে কি না,এখানে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, মাদক সরবরাহের মূল উৎস, পরিবহন নেটওয়ার্ক ও বড় কারবারিদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?
বড় চালান নিয়ে নানা অভিযোগ
স্থানীয়দের একাংশের দাবি, খুচরা পর্যায়ে মাদক বহনকারী বা সেবনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান ও মামলা হলেও মাদকের বড় সরবরাহকারী এবং অর্থের জোগানদাতারা অনেক সময় ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন অভিযোগও করছেন যে বড় চালান গাইবান্ধায় প্রবেশ করলেও সেগুলো সবসময় প্রকাশ্যে আসে না।
তবে বড় চালান ধরা পড়ছে না, অথবা ধরা পড়লেও তা গোপন রাখা হচ্ছে,এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। তাই বিষয়টি নিয়ে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্ত না নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগগুলো সত্য হলে প্রশ্ন উঠবে,মাদকবিরোধী অভিযানের গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, নজরদারি, পরিবহনপথ শনাক্তকরণ ও আন্তঃসংস্থার সমন্বয়ে কোথায় ঘাটতি রয়েছে। আবার অভিযোগ সত্য না হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও অভিযানের পরিসংখ্যানের মাধ্যমে জনমনে তৈরি হওয়া সন্দেহ দূর করা সম্ভব।
বিভাগীয় তদন্তে বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র:
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজন হলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থার কার্যক্রম পর্যালোচনা করে একটি নিরপেক্ষ বিভাগীয় তদন্ত করা যেতে পারে। কোন এলাকায় কতটি অভিযান হয়েছে, কতজন গ্রেপ্তার হয়েছে, কী পরিমাণ মাদক উদ্ধার হয়েছে, উদ্ধারকৃত মাদকের ধরন ও উৎস কী ছিল এবং মামলাগুলোর তদন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে,এসব তথ্য বিশ্লেষণ করলে বাস্তব চিত্র অনেকটাই পরিষ্কার হতে পারে।
একই সঙ্গে মাদক মামলার তদন্তে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ, তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং অর্থনৈতিক লেনদেনের অনুসন্ধানও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুধু সেবনকারী নয়, নজর দিতে হবে সরবরাহ চক্রে:
মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু মাদকসেবী বা খুচরা বিক্রেতাকে গ্রেপ্তার করাই যথেষ্ট নয়,সরবরাহের পুরো চেইন শনাক্ত করা প্রয়োজন। কে মাদক সংগ্রহ করছে, কার মাধ্যমে তা গাইবান্ধায় আসছে, কোথায় মজুত হচ্ছে, কারা পরিবহন করছে এবং কারা অর্থের লেনদেন করছে,এসব প্রশ্নের উত্তর বের করা জরুরি।
আইন অনুযায়ী প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে আদালতের মাধ্যমে শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি মাদকবিরোধী কার্যক্রমে তদন্তের মান, সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহ এবং মামলার বিচারিক প্রক্রিয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
আইন পরিবর্তনের দাবি, তবে বিচারিক অধিকারও গুরুত্বপূর্ণ
মাদক ব্যবসা ও মাদক সেবনের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগের দাবি সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকলেও কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে গণ্য করার আগে আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। একইভাবে ‘মাদক মামলায় কোনো আইনজীবী দাঁড়াতে পারবেন না,এ ধরনের প্রস্তাবের ক্ষেত্রে সংবিধান, ন্যায়বিচারের অধিকার এবং প্রচলিত বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যের বিষয়টি আইন প্রণেতাদের বিবেচনা করতে হবে।
অপরাধ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিরপরাধ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন,আইনের শাসনের স্বার্থে উভয় বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।
জনগণের প্রশ্নের উত্তর দেবে তথ্য
গাইবান্ধায় মাদকবিরোধী অভিযান নিয়ে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন, অভিযান কি শুধু দৃশ্যমান পর্যায়ে সীমাবদ্ধ, নাকি মাদকের মূল সরবরাহকারী ও বড় কারবারিদের বিরুদ্ধেও কার্যকর গোয়েন্দা অভিযান চলছে?
এর উত্তর দিতে হলে প্রয়োজন স্বচ্ছ পরিসংখ্যান, মামলার অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার বক্তব্য।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, ডিবি পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশের প্রতি তাই স্থানীয়দের প্রত্যাশা অভিযোগগুলোকে পাশ কাটিয়ে না গিয়ে প্রয়োজনে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরা হোক। একই সঙ্গে বড় মাদক কারবারি ও সরবরাহ চক্রের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
কারণ, মাদকবিরোধী অভিযানের প্রকৃত সফলতা শুধু কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তা দিয়ে নয়; মাদকের সরবরাহের উৎস ও বড় কারবারের নেটওয়ার্ক কতটা ভেঙে দেওয়া গেছে, তার ওপরও নির্ভর করে।
