8
কৃষকের অজান্তে তার নামে ধান সরবরাহের কাগজ, মিল,চাতালে না থাকা ধান দেখানো হচ্ছে ক্রাশিংয়ে অতিরিক্ত ৫ হাজার মেট্রিক টন সংগ্রহ নিয়ে তোলপাড়
মোঃ শরীফুল আজম (বাবু), গাইবান্ধাঃ
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জসহ জেলার কয়েকটি সরকারি খাদ্য গুদামে ধান ক্রয় না করেই ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলন এবং কৃষকের অজান্তে তার নামে ধান সরবরাহ দেখানোর গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে গুদামে বাস্তবে ধান জমা না দিয়েই বিভিন্ন মিল,চাতালে ধান ভাঙানোর (ক্রাশিং) জন্য সরবরাহ দেখানোর অভিযোগও পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, সংশ্লিষ্ট কিছু খাদ্য কর্মকর্তা, মিল,চাতাল মালিক, ব্যাংক কর্মকর্তা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সমন্বয়ে একটি চক্র সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে অনিয়ম করে বিপুল অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও সরকারি নথিপত্রের পূর্ণাঙ্গ যাচাই প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্ট একাধিক ব্যক্তি ও ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কোনো কোনো কৃষক জানেনই না যে তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র বা কৃষক আইডির বিপরীতে সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সরবরাহ করা হয়েছে। অথচ কাগজপত্রে ওই কৃষকের নামে ধান ক্রয়ের তথ্য দেখিয়ে অর্থ পরিশোধের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার অভিযোগ রয়েছে।
বরাদ্দের চেয়ে প্রায় ৫ হাজার টন বেশি ধান সংগ্রহের দাবিঃ
চলতি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে গাইবান্ধা জেলায় বরাদ্দ ছিল প্রায় ৯ হাজার ৩ শতাধিক মেট্রিক টন। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহ দেখানো হয়েছে ১৪ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি। অর্থাৎ বরাদ্দের তুলনায় প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত ধান সংগ্রহ দেখানোর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, অতিরিক্ত এই ধান সংগ্রহের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সময়ের আগে কোনো স্পষ্ট সরকারি আদেশ, অনুমোদন বা অর্থ ছাড়ের নথি ছিল না। এ কারণে প্রশ্ন উঠেছে বরাদ্দের অতিরিক্ত ধান কেন এবং কীভাবে সরকারি ক্রয় হিসেবে দেখানো হলো?
অভিযোগের হিসাবে, অতিরিক্ত প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন ধানের বাজারমূল্য ১৮ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। ফলে এই বিপুল অর্থের উৎস, অনুমোদন এবং সরকারি হিসাবের সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগেই সংগ্রহ সম্পন্ন?
সরকারি ধান সংগ্রহের নির্ধারিত সময় ছিল ৩১ আগস্ট পর্যন্ত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ৯ আগস্টের আগেই গাইবান্ধা জেলার বিভিন্ন খাদ্য গুদামে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত ধান সংগ্রহ সম্পন্ন হয়েছে বলে কাগজপত্রে দেখানো হয়।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, নির্ধারিত সময়ের আগেই কীভাবে জেলার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কয়েক হাজার টন বেশি ধান সংগ্রহ দেখানো হলো? এই অতিরিক্ত ধানের জন্য কোথা থেকে অর্থের সংস্থান করা হলো এবং কোন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনে তা করা হয়েছে—তা তদন্তের দাবি রাখে।
গুদামে নেই ধান, কাগজে মিল,চাতালে ক্রাশিং
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, কৃষকের কাছ থেকে বাস্তবে ধান সংগ্রহ না করেই বিভিন্ন কৃষকের পরিচয় ও কৃষক আইডি ব্যবহার করে ধান সরবরাহের কাগজ তৈরি করা হয়েছে। পরে ওই ধান সরকারি গুদামে জমা না করেই বিভিন্ন মিল,চাতালে ভাঙানোর জন্য পাঠানো হয়েছে এমন অভিযোগ করেছেন কয়েকজন মিল,চাতাল ব্যবসায়ী।
একাধিক ব্যবসায়ীর ভাষ্য, কাগজে-কলমে ধান ক্রয় ও গুদামে জমা দেখানোর পর সেটি মিল,চাতালে ক্রাশিংয়ের জন্য বরাদ্দ দেখানো হলে পুরো প্রক্রিয়াটির স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
তাদের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে কোনো কোনো কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনৈতিক আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট গুদামের স্টক রেজিস্টার, কৃষকের ব্যাংক হিসাব, ধান ক্রয়ের রসিদ, ডিও, মিল,চাতালের ক্রাশিং রেকর্ড, পরিবহন চালান এবং ব্যাংক লেনদেনের তথ্য পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
কৃষকের নামে ধান, কৃষকই জানেন নাঃ
গাইবান্ধার বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের বক্তব্য, কোনো কৃষকের নামে ধান সরবরাহ দেখানো হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কৃষকের মোবাইল নম্বর, ব্যাংক হিসাব, জাতীয় পরিচয়পত্র এবং কৃষক কার্ডের তথ্য মিলিয়ে দেখলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।
বিশেষ করে যেসব কৃষকের নামে ধান বিক্রি দেখানো হয়েছে, তাদের সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ এবং গুদামের রেকর্ডের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
তদন্তের দাবি সচেতন মহলেরঃ
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি শুধু খাদ্য গুদামের অনিয়ম নয়; বরং সরকারি অর্থ, খাদ্যশস্য সংগ্রহ এবং কৃষকের নামে সরকারি ক্রয় ব্যবস্থার প্রতি বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করবে।
তাদের দাবি, গাইবান্ধা জেলার সব খাদ্য গুদামের ধান সংগ্রহের তথ্য ডিজিটাল রেকর্ড, কৃষকের ব্যাংক হিসাব, গুদামের স্টক রেজিস্টার, ডিও, মিল,চাতালের ক্রাশিং রেকর্ড, পরিবহন চালান এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংক লেনদেন সমন্বয় করে নিরপেক্ষ তদন্ত করা হোক।
অভিযোগ রয়েছে, অনিয়মের বিষয়টি আড়াল করতে বিভিন্ন মাধ্যমে সংবাদ প্রচারের জন্য অর্থ ব্যয়েরও চেষ্টা চলছে। তবে এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে যাচাই প্রয়োজন।
কারা দায়ী—জবাব দেবে তদন্তঃ
গোবিন্দগঞ্জের ভারপ্রাপ্ত খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা পারভেজ হোসেন, গাইবান্ধা সদরের ওসিএলএসডি শাহিদসহ সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের ব্যাখ্যা এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়া হলে অভিযোগগুলো স্পষ্ট ভাবে প্রমাণিত হবে সত্য মিথ্যা। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিপত্র প্রকাশ্যে এলে প্রকৃত সত্য উদঘাটন সম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
বড় প্রশ্ন তিনটিঃ
প্রথমতঃ
বরাদ্দের চেয়ে প্রায় ৫ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত ধান কীভাবে সরকারি সংগ্রহ হিসেবে দেখানো হলো?
দ্বিতীয়তঃ
বাস্তবে ধান সরবরাহ না করেও কোনো কৃষকের নামে ধান ক্রয় দেখানো হয়ে থা
