
সাইফুর রহমান শামীম, কুড়িগ্রাম।। কুড়িগ্রামের উলিপুরে দিনমজুর মুকুল মিয়ার পাঁচ সদস্যের সংসারে নেমে এসেছে চরম দুর্দশা। প্রায় দুই বছর ধরে অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী তিনি। তার অস্বাভাবিক ও হিংস্র আচরণের কারণে নিরাপত্তার স্বার্থে দু’পায়ে লোহার শিকল বেঁধে রেখেছেন পরিবারের সদস্যরা। বন্ধ হয়ে গেছে তার চিকিৎসা। একই সঙ্গে দুই মেয়ে ও একমাত্র ছেলের লেখাপড়াও থমকে গেছে। অভাবের কারণে পরিবারটির দিন কাটছে অনেকটা অনাহারে।মুকুলের পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি ঘুমের মধ্যে সন্তানদের গলা চেপে ধরেন, ঘরের আসবাবপত্র ভাঙচুর করেন এবং কখনো কখনো কাপড়চোপড়ে আগুন ধরিয়ে দেন। তার এমন আচরণে সন্তানরা বাবার কাছেও যেতে ভয় পায়। প্রতিবেশীরাও তার আচরণে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন।
জানা যায়, কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বজরা ইউনিয়নের চর বজরা গ্রামে গিয়ে মুকুল মিয়ার (৩৮) পরিবারের খোঁজ পাওয়া যায়। পরিবারটি প্রায় ১০ বার তিস্তা নদীর ভাঙনের শিকার হয়েছে। বর্তমানে তারা চর বজরার টারীপাড়ায় ওয়াপদা বাঁধের নিচে একটি ঘরে আশ্রয় নিয়ে বসবাস করছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই ছাড়া তাদের কোনো জমিজমা নেই।পরিবারটির একমাত্র বসতঘরটির টিনের চালও জরাজীর্ণ। বিভিন্ন স্থানে ফুটো হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টি ও গরমে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে তাদের। আগে দিনমজুরি করে সংসার চালাতেন মুকুল। কিন্তু প্রায় দুই বছর আগে হঠাৎ তার শরীরে প্রচণ্ড জ্বর ও চুলকানি দেখা দেয়। পরে খাবারের প্রতি অনীহা তৈরি হয়। স্থানীয় চিকিৎসকের কাছে নেওয়ার পরও তার অবস্থার উন্নতি হয়নি। অর্থের অভাবে গ্রামের বাইরে নিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানো সম্ভব হয়নি বলে জানান পরিবারের সদস্যরা।ক্রমে মুকুলের শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। তিনি কাজকর্ম ছেড়ে দেন এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে হিংস্র আচরণ শুরু করেন। একপর্যায়ে স্ত্রী, সন্তান, মা ও অন্য স্বজনদের মারধর করতে থাকেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় নিজেদের নিরাপত্তার জন্য তার দু’পায়ে লোহার শিকল পরিয়ে রাখা হয়েছে।মুকুলের বোন শামসুন্নাহার বলেন, মুকুল দুই বছর ধরে বিছানায় পড়ে আছে। কাজ করতে পারে না। ছেলেমেয়েরা ঠিকমতো খেতে পারে না, চিকিৎসাও বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের লেখাপড়াও বন্ধ। বড় মেয়েটির বিয়ের বয়স হয়েছে। ঘরে খাবার নেই, মেয়ের বিয়ে দেব কীভাবে?
মুকুলের মা আকলিমা বলেন, মুকুল হিংস্র হয়ে গেলে ঘরের জিনিসপত্র ভাঙচুর করে। ছেলে-মেয়ে, স্ত্রী, এমনকি আমাকেও মারধর করে। গলা টিপে ধরে। একবার আমার বুকের পাঁজর ও ঘাড় ভেঙে দেওয়ার মতো অবস্থা করেছিল। আগুনে আমার হাতও পুড়ে গেছে।মুকুলের স্ত্রী কহিনুর বেগম (৩৪) বলেন, আগে আমার স্বামী সুস্থ ছিলেন। আমরা ভালোই ছিলাম। পাঁচজনের সংসার কোনোভাবে চলত। এখন তিনি অসুস্থ, কিন্তু চিকিৎসা করাতে পারছি না। তার অত্যাচারে পরিবারের সবাইসহ গ্রামের মানুষও ভয়ে থাকে। এ কারণে দুই বছর ধরে তার পায়ে শিকল বেঁধে রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, আমার বড় মেয়ে নবম শ্রেণিতে পড়ে। বেতন ও গাইড বই কিনে দেওয়ার সামর্থ্য না থাকায় তার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। সবসময় কাজ থাকে না। তাই ছেলেমেয়েদের ঠিকমতো খাওয়াতেও পারি না। খুব কষ্টে দিন কাটছে। মুকুলের চাচাতো ভাই ফুলমিয়া বলেন, পরিবারটি এতটাই দরিদ্র যে জরাজীর্ণ ঘরটিও মেরামত করার সামর্থ্য নেই। বৃষ্টি হলে টিনের চাল দিয়ে ঘরের ভেতর পানি পড়ে। তাদের দুর্দশা দেখে তিনি পলিথিন কিনে টিনের চাল ঢেকে দিয়েছেন। স্ত্রী কাজ করলে ঘরে ভাত জোটে, না হলে উপবাস করতে হয়।উলিপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. লুৎফর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, মুকুল নামে যে ব্যক্তির তথ্য আপনাদের মাধ্যমে জানতে পেরেছি, আমরা ওই এলাকায় আমাদের ইউনিয়ন সমাজকর্মীকে পাঠাব। তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত সমাজসেবা অধিদপ্তরের নির্ধারিত সেবার আওতায় তাকে আনার চেষ্টা করা হবে।// mobile 01718070388
