মোঃ শরীফুল আজম (বাবু)
অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সরকারের তৎপরতা নিয়ে যখন আলোচনা চলছে, তখনই সামনে আসছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন,অনলাইনে প্রকাশ্যে থাকা জুয়া, বেটিং, পর্নোগ্রাফি এবং অশালীন বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?
বাংলাদেশে অনলাইন জুয়া ও বেটিং প্রতিরোধে ইতোমধ্যে আইন রয়েছে। ২০২৬ সালের জুয়া প্রতিরোধ আইনে অনলাইন জুয়া, বেটিং, জুয়া-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, অ্যাপ, ডোমেইন, IP ঠিকানা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ, গ্রুপ ও চ্যানেল ব্লক, অপসারণ বা নিষিদ্ধ করার আইনি ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। একই আইনে জুয়া প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর দায়িত্বও নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর আগে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর অধীনেও সাইবার স্পেসে জুয়ার পোর্টাল বা অ্যাপ পরিচালনা, জুয়ায় সহায়তা বা উৎসাহ প্রদান এবং জুয়ার বিজ্ঞাপনের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এমনকি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন—বিটিআরসি ২০২৫ সালে অনলাইন জুয়া, বেটিং ও পর্নোগ্রাফি সাইট বন্ধে অংশীজনদের নিয়ে সভা করেছে। বিটিআরসির নিজস্ব তথ্যেও এ বিষয়ে একাধিক সভার উল্লেখ রয়েছে।
তবে সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতায় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—আইন ও উদ্যোগ থাকার পরও এসব কনটেন্ট এবং সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞাপন কীভাবে মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসছে?
কনটেন্ট দেখতে গিয়ে সামনে আসছে অশালীন বিজ্ঞাপন
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সময় অনেক ব্যবহারকারীর অভিযোগ, তারা যে কনটেন্ট দেখতে যান, তার আশপাশে বা ফিডে অনাকাঙ্ক্ষিত ও অশালীন প্রকৃতির বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের ছবিই এমন ধরনের হয়, যা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একসঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা ভিডিও প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের পরিবেশকে বিব্রতকর করে তুলতে পারে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব প্ল্যাটফর্ম কিশোর-কিশোরীরাও ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে। ফলে বয়স-উপযোগী নয় এমন বিজ্ঞাপন বা কনটেন্ট তাদের সামনে কীভাবে পৌঁছাচ্ছে এবং প্ল্যাটফর্মগুলো কীভাবে বিজ্ঞাপন যাচাই করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু ওয়েবসাইট বন্ধ করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে?
অনলাইন জুয়া বা পর্নোগ্রাফির কোনো ওয়েবসাইট বন্ধ করা হলেও একই ধরনের কনটেন্ট নতুন ডোমেইন, মিরর সাইট, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ বা অন্য ডিজিটাল মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ থাকে। ২০২৬ সালের জুয়া প্রতিরোধ আইনেও মিরর বা বিকল্প ডোমেইনের মাধ্যমে জুয়া পরিচালনার বিষয়টি বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
ফলে শুধু একটি-দুটি ওয়েবসাইট বন্ধ করার পরিবর্তে জুয়া ও বেটিংয়ের প্রচারণা, অর্থ লেনদেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিজ্ঞাপন, সংশ্লিষ্ট পেজ-গ্রুপ এবং বিকল্প ডোমেইনের বিরুদ্ধে সমন্বিত নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে।
দায়িত্ব কার?
২০২৬ সালের জুয়া প্রতিরোধ আইনে জুয়া প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইন প্রয়োগ, সমন্বয়, তদারকি ও নীতিগত নির্দেশনার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের ওপর প্রযুক্তিগত নিয়ন্ত্রণ, ডিজিটাল অবকাঠামো তদারকি এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্ম নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, বিটিআরসির রয়েছে অভিযোগ গ্রহণের ব্যবস্থাও।
তাহলে প্রশ্ন হলো—আইন, দায়িত্ব ও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা থাকার পরও সাধারণ ব্যবহারকারীর স্ক্রিনে অনাকাঙ্ক্ষিত জুয়া, বেটিং বা অশালীন বিজ্ঞাপন পৌঁছাচ্ছে কেন?
শিশু-কিশোরদের সুরক্ষা কতটা নিশ্চিত?
ডিজিটাল প্রযুক্তির বিস্তারের সঙ্গে শিশু-কিশোরদের ইন্টারনেট ব্যবহারও বেড়েছে। এ অবস্থায় বয়স-অনুপযোগী বিজ্ঞাপন ও কনটেন্টের প্রবেশ ঠেকানো শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি পরিবার ও সমাজের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিজ্ঞাপনদাতা, বিজ্ঞাপন পরিবেশক, পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে কোনো নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর সেবার বিজ্ঞাপন কীভাবে একটি বৈধ কনটেন্টের পাশে প্রদর্শিত হচ্ছে, সেই ব্যবস্থাপনা নিয়েও নজরদারি জরুরি।
সরকারের কাছে কয়েকটি প্রশ্ন
অনিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালের বিষয়ে সরকারি নিবন্ধনব্যবস্থা ও নিবন্ধিত পোর্টালের তালিকা রয়েছে। তথ্য অধিদফতরের ওয়েবসাইটেও নিবন্ধিত অনলাইন নিউজ পোর্টালের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে।
তাই একইভাবে জনস্বার্থে প্রশ্ন উঠছে
অনিবন্ধিত নিউজ পোর্টাল শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণের মতো অনলাইন জুয়া, বেটিং ও অশালীন বিজ্ঞাপন শনাক্তে কি আরও কার্যকর স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা করা যায় না?
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষিদ্ধ বা বয়স-অনুপযোগী বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হলে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?
কিশোর-কিশোরীদের কাছে এসব বিজ্ঞাপন পৌঁছানো ঠেকাতে সরকারের নির্দিষ্ট কোনো সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা আছে কি?
ব্লক করা ওয়েবসাইট নতুন ডোমেইন বা মিরর সাইটে ফিরে এলে তা শনাক্ত ও বন্ধে কী ধরনের প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?
আইন ও সরকারি উদ্যোগ ইতোমধ্যে রয়েছে। এখন প্রয়োজন সেসব উদ্যোগের বাস্তব প্রয়োগ কতটা কার্যকর হচ্ছে, তার স্বচ্ছ জবাবদিহি।
কারণ একটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল নিবন্ধিত কি না, এটি যেমন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির বিষয়, তেমনি শিশু-কিশোর ও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে জুয়া, বেটিং, পর্নোগ্রাফি এবং অনাকাঙ্ক্ষিত অশালীন বিজ্ঞাপন পৌঁছে যাচ্ছে কি না, সেটিও সমানভাবে জনস্বার্থের প্রশ্ন।
