
প্রতিবেদক: মুহাম্মদ ওসমান গনি চৌধুরী
চট্টগ্রাম পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ওয়াসা) প্রায় ১০ একর জমি জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকে বন্ধক রেখে ২২ কোটি টাকার বেশি ঋণ নিয়েছিলেন এক ব্যবসায়ী। ঋণ পরিশোধ না করায় ব্যাংক যখন ওই জমি নিলামে তোলে, তখন খোদ চট্টগ্রাম ওয়াসা চিঠি দিয়ে জানিয়েছিল— এটি তাদের নিজস্ব সম্পত্তি এবং ভুয়া দলিল বানিয়ে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, সেই জালিয়াতি চক্রের প্রধান হোতা ও ঋণখেলাপি মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়াকেই এবার খোদ চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে বসিয়েছে সরকার।
নিজের জমি জালিয়াতির শিকার হয়ে যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে একসময় আইনি ও দাপ্তরিক লড়াইয়ে নেমেছিল ওয়াসা, ভোজবাজির মতো সেই ব্যক্তিকেই শীর্ষ পদে বসানোয় চট্টগ্রামজুড়ে নজিরবিহীন তোলপাড় শুরু হয়েছে।
যেভাবে ওয়াসার চেয়ারম্যান হলেন ইদ্রিস মিয়া
গত ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ (পানি সরবরাহ-৩ শাখা) থেকে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। সিনিয়র সহকারী সচিব মোছাঃ আখতারুন নেছা স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, পটিয়ার ছনহরা গ্রামের মৃত সিদ্দিক আহমদের ছেলে মোহাম্মদ ইদ্রিস মিয়াকে ‘পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর ৭(১) ধারা অনুযায়ী ৩ বছরের জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসা বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। অথচ নথিপত্র বলছে, সরকারের এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসা ইদ্রিস মিয়াই ওয়াসার সম্পত্তি আত্মসাৎকারী প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স আজমির ট্রেডিং’-এর স্বত্বাধিকারী।
ঋণ জালিয়াতিতে গোটা পরিবার
ইউনিয়ন ব্যাংক লিমিটেডের খাতুনগঞ্জ শাখার নথিপত্র অনুযায়ী, খাতুনগঞ্জের ১১৭ আমির মার্কেটে (হাসান চেম্বার, ২য় তলা) অবস্থিত ‘মেসার্স আজমির ট্রেডিং’-এর নামে এই বিপুল অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়। জালিয়াতির এই ঋণের সঙ্গে ইদ্রিস মিয়ার পরিবারের সদস্যরা সরাসরি যুক্ত। ইদ্রিস মিয়া নিজে এই জমির ভুয়া মালিক সেজে মূল জামিনদার ও বন্ধকদাতা হিসেবে চুক্তিবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রী আলীউননেছা খাতুন প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম জামিনদার। এছাড়া ইদ্রিস মিয়ার ছেলে মোহাম্মদ ইব্রাহীম হাসান এবং সালমা বেগম নামের আরেক নারীও এই ঋণের বন্ধকদাতা ও জামিনদার। ২০২০ সালের ৮ নভেম্বরের হিসাব অনুযায়ী, এই ঋণের বিপরীতে ইউনিয়ন ব্যাংকের আসল ও অন্যান্য চার্জসহ মোট পাওনা দাঁড়ায় ২২ কোটি ২৩ লাখ ৬২ হাজার ৬২২ টাকা ৪৫ পয়সা।
নিলামের উদ্যোগ ও ওয়াসার কড়া প্রতিবাদ
খেলাপি ঋণ আদায়ে ইউনিয়ন ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা ২০২০ সালের ১২ নভেম্বর বন্ধকী সম্পত্তি বিক্রয়ের নিলাম বিজ্ঞপ্তি জারি করে, যা ১৫ নভেম্বর দৈনিক আজাদীতে প্রকাশিত হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বন্দর থানাধীন মধ্য হালিশহর মৌজার মোট ৯৫৭ শতক (৯.৫৭ একর) জমি এবং কোতোয়ালী থানাধীন পাথরঘাটা মৌজায় বাণিজ্যিক ভবনসহ ৫ শতক জমি নিলামে তোলা হয়।
বিজ্ঞপ্তিটি নজরে আসার পরই টনক নড়ে চট্টগ্রাম ওয়াসার। ২০২০ সালের ২৯ নভেম্বর তৎকালীন ওয়াসা সচিব শারমিন আলম ইউনিয়ন ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপককে একটি কড়া চিঠি দেন। চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়, নিলাম বিজ্ঞপ্তির ১নং তফসিলে থাকা মধ্য হালিশহরের ৯৫৭ শতক জমি ওয়াসার স্যুয়ারেজ প্রকল্পের জন্য ১৯৬২-১৯৬৩ সালে অধিগ্রহণ করা সরকারি সম্পত্তি। সালমা বেগমসহ একটি চক্র জাল-ফেরেবি দলিল তৈরি করে তা আত্মসাতের অপচেষ্টা করছে। এমনকি এই জমি নিয়ে ২০০৬ ও ২০১১ সালেও ওয়াসা পত্রিকায় সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল। ওয়াসা সচিব অবিলম্বে এই নিলাম ও হস্তান্তর বন্ধের নির্দেশ দেন এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি অবহিত করেন।
প্রশ্নবিদ্ধ ব্যাংকের ভূমিকা
সরকারি অধিগ্রহণকৃত প্রায় ১০ একর জমি কোনো ধরনের ‘সার্চিং’ বা ভূমি অফিসের রেকর্ড যাচাই-বাছাই ছাড়াই ইউনিয়ন ব্যাংক কীভাবে বন্ধক নিল এবং ২২ কোটি টাকার বেশি ঋণ দিল, তা নিয়ে বড় ধরনের আইনি প্রশ্ন উঠেছে। যাচাই ছাড়া এমন বিপুল ঋণ অনুমোদনের পেছনে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রক্ষক যখন ভক্ষক
যে ব্যক্তির জালিয়াতির কারণে ওয়াসার হাজার কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি বেহাত হওয়ার উপক্রম হয়েছিল, তাঁকেই খোদ প্রতিষ্ঠানের অভিভাবক বা চেয়ারম্যান করায় সুশীল সমাজ ও প্রশাসনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। ওয়াসার কর্মকর্তাদের শঙ্কা, স্বার্থের এই সংঘাতের কারণে ওয়াসার মেগা স্যুয়ারেজ প্রকল্প এবং অন্যান্য স্থাবর সম্পত্তি এখন চরম হুমকির মুখে পড়বে।
