
— মোঃ মহিউদ্দিন
কবি / সাহিত্যিক / সিনিয়র লেকচারার
——————-
ভোলার ২২ লক্ষ মানুষের দুঃখ, বঞ্চনা, অশ্রু আর স্বপ্ন মিলেমিশে যখন এক গভীর আহ্বান হয়ে ওঠে—তখনই জন্ম নেয় ইতিহাস। সেই ইতিহাসের নাম ভোলা–ঢাকা লং মার্চ।
এটি শুধু একটি যাত্রা নয়; এটি একটি দ্বীপের আর্তনাদ, একটি অঞ্চলের ন্যায্য অধিকারের প্রতীক, আরও গভীরে গেলে—এটি ভোলার মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামের বিবরণ।
১. পদ্মার বুকে সাহসের ঢেউ—যেখানে প্রার্থনা মিশে যায় নদীর স্রোতে
যে তরুণরা ভোলা–বরিশাল সেতুর দাবিকে হৃদয়ের প্রদীপ করে হাতে নিয়েছে লং মার্চের পতাকা, তারা পদ্মা সেতুর ওপর দিয়ে হাঁটার অনুমতি না পেলেও ফিরে যায়নি।
বরং তারা বেছে নিয়েছে সবচেয়ে কঠিন পথ—সাঁতরে পদ্মা পার হওয়ার পথ।
খরস্রোতা পদ্মা যখন তারা চোখে চোখ রাখে, তখন এই তরুণ বীরেরা উচ্চারণ করে—
“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”—
বিশ্বাসে, ভরসায়, সাহসে।
এই দৃশ্য শুধু নদী পার হওয়া নয়, এটি একটি শপথ—
ভোলার মানুষ আর ফিরবে না বঞ্চনার অন্ধকারে।
ঠিক সেই মুহূর্তে সহযোদ্ধা নোমান ভাই মৃত্যুযন্ত্রণায় জর্জরিত হয়ে পড়লেন নদীর বুকেই।
২২ লক্ষ মানুষের দোয়া যেন বাতাসের মতো ছুঁয়ে গেল তাকে।
অবশেষে তিনি ফিরে এলেন জীবন যুদ্ধে—
প্রমাণ হলো, ভোলার কান্না, ভোলার প্রার্থনা কখনো ব্যর্থ হয় না।
২. ভোলার মানুষের দাবি—রক্তমাংসের দাবি, জীবনের দাবি
ভোলা–বরিশাল সেতুর দাবি কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়।
এটি হলো—
মায়ের আর্তনাদ,
রোগীর শেষ নিঃশ্বাস,
নদীর ফেরি ঘাটে মৃত্যুর সাথে প্রতিদিনের যুদ্ধ।
ঝড়-বৃষ্টিতে বন্ধ লঞ্চ,
রাতের আঁধারে অসুস্থ শিশু কোলে নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকা বাবা,
অপারেশন-পরবর্তী রোগীকে নদীর ওপারে পৌঁছাতে গিয়ে জীবন ঝরে যাওয়া
এই বেদনাই ভোলার বাস্তবতা।
সে কারণেই তরুণ বীর পায়ে হাঁটা যাত্রা শুরু করেছে।
তারা নিজের ভবিষ্যতের জন্য নয়, পুরো একটি জেলার বাঁচার অধিকারের জন্য লড়ছে।
৩. ২২ লক্ষ মানুষের কৃতজ্ঞতা—যে সন্তানেরা স্বপ্নকে কাঁধে তুলে নিয়েছে
আজ ভোলার মানুষ শুধু গর্বিত নয়—
তারা কৃতজ্ঞ, আবেগাপ্লুত, ঋণী।
মানুষ বলছে—
“ভোলার ২২ লক্ষ মানুষ আপনাদের কাছে দায়বদ্ধ।”
কারণ, এই তরুণরা শুধু মিছিল করেনি—
তারা ভোলার শতবর্ষের বঞ্চনাকে ভাষা দিয়েছে,
তাদের হাঁটা—আমাদের স্মৃতির নদীতে এক নতুন স্রোত।
৪. কুইন আইল্যান্ডের স্বপ্নবাজ বিহঙ্গেরা
ভোলা—বাংলাদেশের লুকানো সৌন্দর্যের রানি, Queen Island।
প্রাকৃতিক গ্যাস, কৃষির সোনা, নদীর দয়া—সবই আছে, নেই শুধু এক টুকরো সেতু।
যে সেতু ভোলাকে যোগ করবে মূল ভূখণ্ডের প্রাণচক্রে।
এই লং মার্চের তরুণরা তাই আমাদের নতুন প্রজন্মের দূত—
সূর্যের উত্তাপে পুড়ে, রাতের অন্ধকারে পথ হারিয়ে, ধুলাবালির ভেতর দিয়ে এগিয়ে তারা পৌঁছেছে নির্দিষ্ট স্থানে ।
সামনে আরও পথ, আরও পরিশ্রম।
কিন্তু তাদের চোখে ক্লান্তি নেই—
শুধু একটি স্লোগানের আগুন—
“ভোলা–বরিশাল সেতু চাই!”
৫. বাংলার নতুন প্রজন্ম—পরিবর্তনের আগুন হাতে
আজ সোশ্যাল মিডিয়া সরগরম,
ভোলা ঘাট থেকে রাজধানীর ব্যস্ত রাস্তা শাহাবাগে।
সকলেই বলছে,
এই প্রজন্মই বদলে দেবে ভবিষ্যৎ।
লং মার্চ শুধুই হাঁটা নয়—
এটি ঘোষণা—
ভোলার দাবি আর চুপ থাকবে না।
এটি বিদ্রোহ নয়,
এটি ন্যায্য অধিকারের শান্ত শক্তি।
৬. তাদের জন্য দোয়া চাই—দেখুন, এরা বাংলার সম্পদ
কালেমা পড়া কণ্ঠে, ভেজা হৃদয়ে, কাঁপা দোয়া নিয়ে তারা নামছে পদ্মার ঢেউয়ে।
তাদের এই যাত্রায় ভোলা তো আছেই,
সাথে আছে আশীর্বাদ, প্রার্থনা, ভালোবাসা—বাংলার নানা প্রান্ত থেকে।
যারা পদ্মা সেতুর আশেপাশে থাকেন—
এই তরুণদের পাশে দাঁড়ান,
কারণ এরা শুধু ভোলার সন্তান নয়—
সমগ্র বাংলাদেশের সম্পদ।
ভোলা–বরিশাল সেতু: একটি দ্বীপের মুক্তি, একটি জাতির দায়িত্ব
বিগত যুগ ধরে ভোলা উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত হয়েছে কেবল একটি সেতুর অভাবে।
এই সেতু কেবল ইট-বালুর কাঠামো নয়—
এটি ভোলার মুক্তির সোপান।
১. অর্থনীতির নতুন দিগন্ত
ভোলা মাছ, কৃষি, গ্যাস—সবকিছুতেই সম্ভাবনার মহাসাগর।
একটি সেতু হলে এই অর্থনীতিই দক্ষিণাঞ্চলের রূপ বদলে দেবে।
কৃষক বাঁচবে, বাজার বাড়বে, জিডিপিতে যোগ হবে বিপুল অবদান।
২. জীবন রক্ষা
জরুরি চিকিৎসায় সময়ই জীবন।
নদীর বিলম্বে কত জীবন থমকে গেছে তার গুণে শেষ নেই।
একটি সেতু মানেই—
আর একটি মা সন্তান হারাবে না,
আর একটি রোগী ফেরিঘাটে মৃত্যুর কোলে যাবে না।
৩. বিচ্ছিন্নতার অবসান
শিক্ষা, চাকরি, চিকিৎসা—ভোলার মানুষ প্রতিদিন যেসব চ্যালেঞ্জে পড়ে, তার মূলেই রয়েছে নদী পারাপারের বাধা।
সেতু এলে ভোলা দাঁড়াবে দেশের সাথে সমানতালে।
৪. পর্যটনের সুবর্ণ দ্বার—
ভোলার প্রকৃতিকে জানলে যে কেউ মুগ্ধ হবে।
যোগাযোগ সহজ হলে পর্যটন হবে নতুন কর্মসংস্থানের দিগন্ত।
শেষবাক্য—
একদিন—
হয়তো খুব শিগগিরই—
যখন ভোলা–বরিশাল সেতু দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাকবে পদ্মার ঢেউয়ের ওপরে,
যখন রোগী বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স নদীর দিকে তাকিয়ে কাঁদবে না,
যখন ঘাটের অপেক্ষার অসহায়তা ইতিহাসের পাতায় ঠাঁই নেবে—
তখন লেখা থাকবে—
কিছু তরুণ ছিল,
যাদের পদচারণাই বদলে দিয়েছিল ভোলার ভাগ্য,
যাদের সাহস পদ্মার জলে ছড়িয়েছিল নতুন ইতিহাসের আলো।
