
মোঃ শরীফুল আজম (বাবু)
গাইবান্ধা:
কৃষক নিবন্ধন, লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন, সরকারি নির্ধারিত মূল্যে ধান সংগ্রহ এবং ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ—সব মিলিয়ে স্বচ্ছ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে ২০২৬ সালের বোরো মৌসুমের ধান সংগ্রহ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে গাইবান্ধা জেলা খাদ্য বিভাগ।
অ্যাপসের মাধ্যমে নিবন্ধন ও লটারিতে নির্বাচিত হয়ে সরকারি গুদামে ধান দিতে পেরে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন জেলার কৃষকেরা।
ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল এবং জেলা খাদ্য বিভাগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন তারা।
চলতি মৌসুমে গাইবান্ধা জেলায় ধান সংগ্রহের সরকারি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯ হাজার ৫৬৩ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে অর্জিত হয়েছে ১৪ হাজার ৩৯৬ মেট্রিক টন। অর্থাৎ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪ হাজার ৮৩৩ মেট্রিক টন বেশি ধান সংগ্রহ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, চাউল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৬ হাজার ৪৩৮ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে অর্জন হয়েছে ২৪ হাজার ৪৪৫ মেট্রিক টন।
জেলা খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে প্রকৃত কৃষকদের কাছ থেকে সরকারি নিয়মে ধান সংগ্রহ নিশ্চিত করতে জেলার বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক প্রচারণা চালানো হয়। কৃষকদের মধ্যে লিফলেট বিতরণের পাশাপাশি অ্যাপসের মাধ্যমে নিবন্ধন ও আবেদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে তাদের অবহিত করা হয়।
এর ফলে কৃষকেরা নিজেদের অথবা পরিবারের সদস্যদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে অনলাইনে আবেদন ও নিবন্ধন করতে সক্ষম হন। একই সঙ্গে সরকারি খাদ্য গুদামে কখন, কীভাবে এবং কোথায় ধান দিতে হবে সে সম্পর্কেও তারা স্পষ্ট ধারণা পান।
পরে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত কৃষকদের কাছ থেকে সরকারি নির্ধারিত ৩৬ টাকা কেজি দরে ধান সংগ্রহ করা হয়। প্রতি কৃষকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ তিন মেট্রিক টন করে ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। সংগৃহীত ধানের মূল্য কৃষকদের নিজস্ব ব্যাংক হিসাবে পরিশোধ করা হয়েছে।
জেলার গাইবান্ধা সদর, বোনারপাড়া, ফুলছড়ি, সাঘাটা, সাদুল্লাপুর, নলডাঙ্গা, বামনডাঙ্গা, সুন্দরগঞ্জ, ময়নাগঞ্জ, গোলাপবাগ, কামদিয়াসহ মোট ১১টি এলএসডি থেকে নির্বাচিত কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হয়েছে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অ্যাপসের মাধ্যমে নিবন্ধন, লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন এবং ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে সরাসরি ধানের মূল্য পাওয়ার বিষয়টি তাদের কাছে স্বচ্ছ, সহজ ও যুগোপযোগী মনে হয়েছে।
সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলার কয়েকজন কৃষক জানান, এবার তারা সরকারি ব্যবস্থাপনায় ধান দেওয়ার ক্ষেত্রে হয়রানিমুক্ত পরিবেশ পেয়েছেন।
নির্ধারিত নিয়মে গুদামে ধান দেওয়ার পর ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ন্যায্যমূল্য পাওয়ায় তারা সন্তুষ্ট।
একাধিক কৃষক বলেন, সরকারি নির্ধারিত দামে ধান বিক্রি করতে পেরে তারা উপকৃত হয়েছেন। এ ধরনের কৃষকবান্ধব ব্যবস্থা ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখার দাবি জানান তারা।
গুদামে খাদ্যশস্যের বড় মজুত
ধান সংগ্রহের পাশাপাশি জেলার সরকারি খাদ্য গুদামগুলোতে খাদ্যশস্য নিরাপদে সংরক্ষণের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জনাব নিত্যানন্দ কুন্ডুর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলার বিভিন্ন খাদ্য গুদামের সাধারণ ধারণক্ষমতা ও বর্তমানে মজুত খাদ্যশস্যের পরিমাণ দেওয়া হলো:
গাইবান্ধা সদর: সাধারণ ধারণক্ষমতা ১১৫০০ মেট্রিক টন; মোট মজুত খাদ্যশস্য ৯৮২৬.১৫১ মেট্রিক টন।
সাঘাটা, বোনারপাড়া: সাধারণ ধারণক্ষমতা ২৭৫০ মেট্রিক টন; মোট মজুত খাদ্যশস্য ৩৯৬৭.৮২৮ মেট্রিক টন।
সাদুল্লাপুর: সাধারণ ধারণক্ষমতা ১৫০০ মেট্রিক টন; মোট মজুত খাদ্যশস্য ১৮১৯.২০১১ মেট্রিক টন।
নলডাঙ্গা: সাধারণ ধারণক্ষমতা ১৫০০ মেট্রিক টন; মোট মজুত খাদ্যশস্য ১৮১৯.২১১ মেট্রিক টন।
সুন্দরগঞ্জ: সাধারণ ধারণক্ষমতা ৩০০০ মেট্রিক টন; মোট মজুত খাদ্যশস্য ৩০৭১.৮৬৩ মেট্রিক টন।
বামনডাঙ্গা: সাধারণ ধারণক্ষমতা ১০০০ মেট্রিক টন; মোট মজুত খাদ্যশস্য
১৩৮৩.২৯৬ মেট্রিক টন।
গোলাপবাগ, গোবিন্দগঞ্জ: সাধারণ ধারণক্ষমতা ২০০০ মেট্রিক টন; মোট মজুত খাদ্যশস্য ২৭১০.১৬৮ মেট্রিক টন।
মহিমাগঞ্জ: সাধারণ ধারণক্ষমতা ২৫০০ মেট্রিক টন; মোট মজুত খাদ্যশস্য
২৫৩৫.১১২ মেট্রিক টন।
কামদিয়া: সাধারণ ধারণক্ষমতা ৪০০ মেট্রিক টন; মোট মজুত খাদ্যশস্য ৫৭৮৩.২৭০ মেট্রিক টন।
পলাশবাড়ী: সাধারণ ধারণক্ষমতা ২৫০০ মেট্রিক টন,
মোট মজুত খাদ্যশস্য ৩২৯২.৪৩৬ মেট্রিক টন।
ফুলছড়ি: সাধারণ ধারণক্ষমতা ১০০০ মেট্রিক টন, মোট মজুত খাদ্যশস্য ১৫১৫.৭১০ মেট্রিক টন।
ধানের মান রক্ষায় নিয়মিত তদারকি:
সরকারি খাদ্য গুদামে সংগৃহীত ধানের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। পোকামাকড়ের আক্রমণ, আর্দ্রতা ও অন্যান্য কারণে খাদ্যশস্যের ক্ষতি রোধে গুদামগুলোতে নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
সংরক্ষিত খাদ্যশস্যের মান ঠিক রাখা এবং সরকারি খাদ্য মজুত নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিয়মিতভাবে গুদামের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বক্তব্য
ধান সংগ্রহ ও মজুদের বিষয়ে আলোচিত কণ্ঠের প্রতিবেদকের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় গাইবান্ধার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক জনাব নিত্যানন্দ কুন্ডু বলেন, বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নে কৃষকের উৎপাদিত খাদ্যশস্য যথাযথভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, গাইবান্ধা জেলায় অত্যন্ত সুন্দর পরিবেশে সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করে কৃষক নির্বাচন ও ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। অ্যাপসের মাধ্যমে কৃষক নিবন্ধন এবং লটারির মাধ্যমে কৃষক নির্বাচন করায় প্রকৃত কৃষকের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা সম্ভব হয়েছে।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আরও বলেন, কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করার পাশাপাশি গুদামে সংগৃহীত ধানের যাতে কোনো ধরনের ক্ষতি না হয়, সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ধান যাতে পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা পায় এবং গুণগত মান অক্ষুণ্ন থাকে, সে জন্য সার্বক্ষণিক তদারকি চলছে।
তিনি আরও জানান, গাইবান্ধা জেলার প্রতিটি খাদ্য গুদামের ধারণক্ষমতা ও মজুত পরিস্থিতি নিয়ম
