up
স্বপন কুমার রায় খুলনা ব্যুরো প্রধান
খুলনার দাকোপ উপজেলার কামারখোলা ইউনিয়নে নিরাপদ পানি সংকট সমাধান এবং জলবায়ু সহনশীল পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে অ্যাডভোকেসি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) কামারখোলা ইউনিয়ন মিলনায়তনে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
**“Conduct advocacy meeting with DPHE and Local Government to bring solutions for the water crisis”** শীর্ষক এ সভার মূল লক্ষ্য ছিল উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপদ পানির সংকট চিহ্নিত করা, বিদ্যমান পানি সরবরাহ ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও স্থায়িত্ব নিয়ে আলোচনা করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য সমাধানগুলো নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি সংশ্লিষ্টদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা।
সভায় সভাপতিত্ব করেন কামারখোলা ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান **জনাব নূর ইসলাম**। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন **জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (DPHE)-এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ**। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন **JJS-এর উপজেলা কো-অর্ডিনেটর জনাব শোয়াইব ইসলাম**।
এছাড়াও সভায় কামারখোলা ইউনিয়ন পরিষদের সকল সদস্য, ইউনিয়ন প্রশাসনিক কর্মকর্তা, বিভিন্ন এনজিও ও উন্নয়ন সংস্থার প্রতিনিধি, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ এবং Rainwater Harvesting (RWH) সুবিধাভোগী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বক্তারা বলেন, উপকূলীয় দাকোপে নিরাপদ পানির সংকটের অন্যতম কারণ হলো ভূগর্ভস্থ ও উপরিভাগের পানিতে লবণাক্ততার প্রভাব, শুষ্ক মৌসুমে মিঠা পানির উৎসের স্বল্পতা এবং বিভিন্ন বিদ্যমান পানি সরবরাহ ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণজনিত সমস্যা। জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতও উপকূলীয় এলাকার পানি নিরাপত্তাকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে।
এ অবস্থায় **বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ বা Rainwater Harvesting** দাকোপের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প নিরাপদ পানির উৎস হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে সভায় গুরুত্বারোপ করা হয়। তবে শুধু RWH ট্যাংক স্থাপন করলেই এর সুফল নিশ্চিত হবে না; সঠিকভাবে ব্যবহার, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, First Flush ব্যবস্থার ব্যবহার, ছাদ ও ক্যাচমেন্ট পরিষ্কার রাখা, ফিল্টার ও পাইপলাইন রক্ষণাবেক্ষণ এবং সংরক্ষিত পানির নিরাপদ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি বলে সভায় আলোচনা করা হয়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে **DPHE-এর উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ** নিরাপদ পানি ব্যবহারের পাশাপাশি Rainwater Harvesting ব্যবস্থার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি সুবিধাভোগীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন এবং RWH ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার নিশ্চিত করতে কীভাবে ট্যাংক, পাইপ, ফিল্টার, First Flush ও অন্যান্য অংশ নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্রিফিং দেন।
তিনি বলেন, **একটি Rainwater Harvesting System স্থাপন করার পর সেটির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই এর স্থায়িত্বের মূল চাবিকাঠি।** বৃষ্টির পানি সংগ্রহের আগে ছাদ পরিষ্কার রাখা, প্রথম বৃষ্টির পানি সরিয়ে দেওয়া, নির্দিষ্ট সময় পরপর ট্যাংক পরিষ্কার করা এবং পানির গুণগত মান সম্পর্কে সচেতন থাকা প্রয়োজন।
সভায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বলেন, কামারখোলা ইউনিয়নের অনেক মানুষ নিরাপদ মিঠা পানির সংকটের মধ্যে বসবাস করছেন। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট আরও তীব্র হয়। তাই বিদ্যমান RWH ব্যবস্থা সচল রাখার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন নিরাপদ পানির উৎস সৃষ্টি এবং অকার্যকর পানি সরবরাহ ব্যবস্থা পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
JJS-এর উপজেলা কো-অর্ডিনেটর **জনাব শোয়াইব ইসলাম** প্রকল্পের কার্যক্রম ও নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি সুবিধাভোগীদের RWH ব্যবস্থার যথাযথ ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণে আরও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
সভায় স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা, এনজিও প্রতিনিধি ও সুবিধাভোগীদের মধ্যে সরাসরি প্রশ্নোত্তর পর্ব অনুষ্ঠিত হয়। এতে RWH ট্যাংকের পানি সংরক্ষণ, ট্যাংক পরিষ্কার, ফিল্টার রক্ষণাবেক্ষণ, পানির নিরাপত্তা, শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ এবং জরুরি সময়ে নিরাপদ পানির ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন ও মতামত উঠে আসে।
বক্তারা বলেন, দাকোপের মতো জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানি নিশ্চিত করতে **Rainwater Harvesting, উপযোগী ভূগর্ভস্থ পানির উৎস, Surface Water Treatment, ছোট পরিসরের পাইপড পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং জরুরি পানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
সভায় আরও গুরুত্ব দেওয়া হয় যে, পানি সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং বিদ্যমান পানি সরবরাহ ব্যবস্থার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, স্থানীয় পর্যায়ে দায়িত্বশীলতা এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন।
**Concern Worldwide, JJS ও KOICA-এর সহযোগিতায় বাস্তবায়িত Enhancing Resilience of Coastal Communities (ERCC-II) Project-এর আওতায় আয়োজিত এ অ্যাডভোকেসি সভার মাধ্যমে দাকোপের উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর নিরাপদ পানি ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকার ও সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।**
সভায় উপস্থিত অংশগ্রহণকারীরা আশা প্রকাশ করেন, এ ধরনের সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে কামারখোলা ইউনিয়নসহ দাকোপের অন্যান্য উপকূলীয় এলাকায় নিরাপদ পানি সংকট মোকাবিলা এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ আরও সুগম হবে।
