
মোঃ হাসান ফরাজী
বোরহানউদ্দিন (ভোলা):
মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার বুকজুড়ে ধীরে ধীরে কমছে মাছ ধরার ব্যস্ততা। ঘাটে ফিরছে ট্রলার, গুটিয়ে নেওয়া হচ্ছে জাল। কোনো জেলে জাল শুকাচ্ছেন, কেউ ছেঁড়া জাল মেরামত করছেন। আবার কেউ শেষবারের মতো নদীর দিকে তাকিয়ে হিসাব কষছেন—আগামী ২২ দিন কীভাবে চলবে সংসার?
মা ইলিশের নিরাপদ প্রজনন নিশ্চিত করতে আজ বুধবার (৭ অক্টোবর) মধ্যরাত থেকে ভোলার বোরহানউদ্দিন উপজেলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে শুরু হচ্ছে ২২ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা। এ সময় ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও কেনাবেচা নিষিদ্ধ থাকবে। নিষেধাজ্ঞা ঘিরে জেলেরা আইন মেনে নদী ছাড়তে শুরু করলেও কর্মহীন ২২ দিন কীভাবে পরিবারের ব্যয় মেটাবেন—সেটিই এখন তাদের বড় উদ্বেগ।
সরেজমিনে উপজেলার হাকিমউদ্দিন, হাসাননগর, মির্জাকালু ও সাচড়াসহ বিভিন্ন মাছঘাট ঘুরে দেখা গেছে, নদী থেকে একে একে ফিরছে মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলার। ঘাটে সারিবদ্ধভাবে রাখা হচ্ছে নৌযান। শেষ মুহূর্তে যারা নদীতে রয়েছেন, তারাও নিষেধাজ্ঞা শুরুর আগেই ঘাটে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
২২ দিনের কর্মহীনতা, সামনে সংসারের খরচ
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, বোরহানউদ্দিন উপজেলায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ১৯ হাজার ৮৩৮ জন। এবারের নিষেধাজ্ঞায় ১৭ হাজার ২০০ জেলের জন্য মাথাপিছু ২৫ কেজি করে মোট ৪৩০ মেট্রিক টন ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
তবে জেলেদের বক্তব্য, নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে শুধু চাল দিয়ে ২২ দিনের সংসার চালানো কঠিন। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচের পাশাপাশি রয়েছে নৌকা ও জাল মেরামতের ব্যয়, ধারদেনা এবং বিভিন্ন এনজিওর ঋণের কিস্তি। ফলে নিষেধাজ্ঞা তাদের কাছে শুধু মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা নয়, একই সঙ্গে আয়ের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার সময়ও।
মির্জাকালু ঘাটে ট্রলার বাঁধছিলেন প্রবীণ জেলে রহিম মাঝি। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বলেন, সরকারের আইন তো মানতেই হইবো, তাই ডাঙ্গায় উইঠা আইছি। কিন্তু এই ২২ দিন পোলাপান লইয়া খামু কী? সরকারি যে ২৫ কেজি চাল দেয়, তা দিয়া কি পুরা মাস চলে? এর মধ্যে আবার এনজিওর কিস্তির চাপ। ধারদেনা কইরা কোনোমতে সংসার চালাইতে হইবো।
হাকিমউদ্দিন ঘাটের জেলে সাত্তার হাওলাদার বলেন, নদীতে না গেলে আমাগো ইনকাম জিরো। অবরোধের সময় সরকার যে চাল দেয়, তা হাতে পাইতে পাইতে অবরোধ অর্ধেক শ্যাষ হইয়া যায়। অনেক সময় আসল জেলেরা ঠিকমতো পায়ও না। অবরোধ শুরুর লগেলগেই চালটা হাতে দেওয়া হোক। এই সময় অন্তত এনজিওর কিস্তি নেওয়া বন্ধ থাকুক।
সাচড়া ঘাটে ছেঁড়া জাল বুনছিলেন তরুণ জেলে জামাল। তাঁর ভাষায়, পেট তো আর অবরোধ বোঝে না ভাই! পরিবারের মুখের দিকে তাকাইয়া এই ২২ দিন আমাগো কাছে ২২ বছরের সমান মনে হয়।
মা ইলিশ রক্ষায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করতে নদীতে কঠোর নজরদারির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের অভিযোগ, অতীতে নিষেধাজ্ঞার সময়ে কোথাও কোথাও নজরদারির ঘাটতির সুযোগ নিয়ে অসাধু জেলেরা নদীতে মাছ শিকার করেছেন। এতে একদিকে আইন অমান্য হয়েছে, অন্যদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইলিশের প্রজনন।
তাদের মতে, নিষেধাজ্ঞা সফল করতে শুধু নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না; নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট, মাছঘাট ও নৌযান চলাচলের এলাকাগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে প্রকৃত জেলেদের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি সহায়তা দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে পৌঁছে দেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
বোরহানউদ্দিন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মনোজ কুমার শাহা বলেন, মা ইলিশ রক্ষায় আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে রয়েছি। আজ মধ্যরাত থেকেই নদীতে নৌ-পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সমন্বয়ে কঠোর নজরদারি শুরু হবে। আইন অমান্য করলে জেল-জরিমানাসহ জাল ও ট্রলার বাজেয়াপ্ত করা হবে।
তিনি আরও বলেন, জেলেদের কষ্ট লাঘবে ১৭ হাজার ২০০ নিবন্ধিত জেলের জন্য বরাদ্দকৃত ৪৩০ টন চাল দ্রুত ও স্বচ্ছতার সঙ্গে বিতরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ এবং উপকূলীয় অঞ্চলের হাজারো মানুষের জীবিকার অন্যতম প্রধান উৎস। প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ নির্বিঘ্নে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে ভবিষ্যতে ইলিশের উৎপাদন ও প্রাপ্যতা বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে ইলিশ রক্ষার এই উদ্যোগ সফল করতে জেলেদের অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে যেমন নিষেধাজ্ঞার সময়ে নদীতে মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হবে, অন্যদিকে প্রকৃত জেলেদের সরকারি সহায়তা সময়মতো নিশ্চিত করতে হবে। কারণ নদী বন্ধ থাকলেও জেলেদের ঘরে চুলা বন্ধ থাকে না।
বোরহানউদ্দিনের নদীপাড়ের জেলেদের প্রত্যাশা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হবে মা ইলিশ নিরাপদে ডিম ছাড়ার সুযোগ পাবে এবং নিষেধাজ্ঞা শেষে নদী আবার ভরে উঠবে ইলিশে। সেই সঙ্গে এই সাময়িক কর্মহীনতার সময়ে সরকারি সহায়তাও যথাসময়ে তাদের হাতে পৌঁছাবে।
